ক্রসফায়ারের নিরাপদ জোন মেরিন ড্রাইভ সড়ক

দুই বছরে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি
ক্রসফায়ারের নিরাপদ জোন মেরিন ড্রাইভ সড়ক
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের একটি অংশ। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের দীর্ঘতম অখণ্ড বালিয়াড়ি সমৃদ্ধ সৈকতের শহর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কটি ক্রসফায়ারের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে প্রদীপ কুমার দাশের যোগদানের পর থেকেই মেরিন ড্রাইভ সড়ক ‘ক্রসফায়ারের’ নিরাপদ জোনে পরিণত হয়। দুই বছরে এ সড়কে ক্রসফায়ারে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা করা ছিল ঐ এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনা। এই উন্মাদনা থেকে বাঁচতে পারেননি মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানও।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২২ মাসে টেকনাফে ১৪৪টি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২০৪ জন মারা গেছেন। তাদের অর্ধেকের বেশি লাশ পড়েছিল মেরিন ড্রাইভে। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। যাকে ক্রসফায়ার করা হতো তাকে ১০ থেকে ১২ দিন থানা হাজতে রাখা হতো। আবার মাসের পর মাস থানা হাজতে রাখার ঘটনাও রয়েছে। এ সময় ক্রসফায়ারে না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঐ ব্যক্তির পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে আদায় করা হতো লাখ লাখ টাকা। তবে শেষ সম্বলটুকু দিয়েও বাঁচতে পারেনি অনেকেই।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, টাকার জন্য মরিয়া ওসি প্রদীপের মতো এমন পুলিশ কর্মকর্তা জীবনে দেখিনি। ক্রসফায়ারের নামে মানুষ খুন করা ছিল তার নেশা। টেকনাফ থেকে প্রদীপ কয়েকশ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের ডানে-বামে থাকা পাঁচ-ছয় জন ও টেকনাফের স্থানীয় কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই ওসি প্রদীপের ক্রসফায়ার ও চাঁদাবাজির লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসবে।

সূত্র মতে, টেকনাফের গুদারবিল এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু ছৈয়দ এবং সাবরাংয়ের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আছারবনিয়ার ইউপি সদস্য শরীফ প্রকাশ শরীফবলি ছিল ওসি প্রদীপের অপকর্মের পাবলিক দোসর। প্রদীপের টাকায় মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে গরু এনে টেকনাফ হয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে বিক্রি করা টাকা বুঝে নিত প্রদীপের লোকজন।

অধিকাংশ ক্রসফায়ারের চাঁদাবাজির টাকাও এ দুই মেম্বারের হাতে জমা হতো। অন্য টাকা নিত প্রদীপের বডিগার্ড কনস্টেবল সাগর। এভাবেই চলেছে প্রদীপের আটক ও ক্রসফায়ারের হুমকি বাণিজ্য।

ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আটক ব্যক্তির পরিবার থেকে লুটে নেওয়া হতো স্বর্ণালংকারও। তা বিক্রি করা হতো চট্টগ্রামের স্বর্ণ মহাজন সজল ধরের কাছে। তার কাছে যেত লুণ্ঠিত সব ধরনের স্বর্ণালংকার। প্রদীপের টেকনাফে স্থানীয় সহযোগীর মধ্যে অন্যতম হিসেবে নাম এসেছে টেকনাফ কমিউনিটি পুলিশের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল হোসাইনের। পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন তিনি। ২৭ জুলাই সেন্টমার্টিন থেকে আটক মাছ ব্যবসায়ী জুবাইয়েরকে ক্রসফায়ার থেকে বাঁচানোর কথা বলে দুই দফায় ১০ লাখ টাকা আদায় করেন নুরুল হোসাইন ও আবদুল কাইয়ুম নামে দুই জন। এর পরও ভাইকে ছাড়াতে না পেরে ওসি প্রদীপ মামলায় জড়ানোর পরই জুবাইয়েরের ভাই ইউনুছ টাকা ফেরত পেতে সহযোগিতা চেয়ে টেকনাফের ইউএনও এবং একটি বিশেষ গোয়েন্দা শাখার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

নিজের কর্ম এলাকা না হলেও গত ২৪ জুলাই রাতে উখিয়ার কুতুপালং থেকে ইউপি সদস্য মৌলভী বখতিয়ারকে ধরে নিয়ে যান ওসি প্রদীপ। তার সঙ্গে নিয়ে যান রোহিঙ্গা তাহের নামে আরেকজনকে। রাতে এসে বখতিয়ার মেম্বারের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্ধকোটি টাকা নিয়ে যান ওসি প্রদীপ। পরে তাকে প্রাণে না মারতে তার ছেলে হেলালের থেকে নেওয়া হয় আরো ২৭ লাখ টাকা। জমি-মার্কেট বন্ধক রেখে চাহিদা মতো টাকা দেওয়া হলেও এর একদিন পর দুই জনকেই কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মেরে ফেলা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায়, মৌলভী বখতিয়ারের ঘর থেকে ১০ লাখ নগদ টাকা এবং ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের গল্প লিখা হয়। এসব তথ্য একটি বিশেষ সংস্থার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন মৌলভী বখতিয়ারের স্ত্রী।

ভুক্তভুগী সাবরাং কাটাবনিয়ার কামাল হোসেন বলেন, গত বছরের ৭ জানুয়ারি টেকনাফ থানার এএসআই সজিব দত্ত ভাই আবুল কালামকে আটক করে থানায় তিন দিন আটকে রাখে। পরে আমার মা জরিনা খাতুন অনেক আকুতিমিনতি করে এএসআই সজিব দত্তের সঙ্গে ৫ লাখ টাকায় ছেড়ে দেওয়ার কথা হয়। মা নিজ হাতে সজিবকে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেন। এর পরে ১০ জানুয়ারি সকালে আমার ভাইকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়। টাকা দিয়েও মা তার ছেলের প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি। পরে এএসআই সজিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ৩ লাখ টাকা ফেরত দেয়। বাকি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এখনো দেয়নি।

তার মতে, ভাই কালাম ইয়াবা গডফাডার নয়, তার বিরুদ্ধে মাদক মামলাও ছিল না। জমিজমা নিয়ে মারামারির মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। আমি এবং পরিবার আবুল কালাম হত্যার বিচার চাই। প্রদীপ সিন্ডিকেটের হাতে টেকনাফের আওয়ামী লীগ নেতা হামজালাল মেম্বারও আটকে ছিলেন। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি পুলিশ তাকে আটক করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে তাকে ৩ হাজার পিস ইয়াবা দিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়।

একইভাবে টেকনাফ সদরের পল্লানপাড়ার আব্দু শুক্কুর বিএকে আটক করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৪ লাখ টাকা, উত্তর লম্বরীর মুফতি জাফরের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা। মিঠাপানির ছড়ার সরওয়ারের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা। ওমর হাকিম মেম্বারের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা। ছোট হাবিরপাড়ার মহিউদ্দীনের কাছ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। ইসলামাবাদের নেজাম থেকে দুই দফায় ৯ লাখ টাকা। মিঠা পানির ছড়ার মো. তৈয়ুবের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা। রাজার ছড়ার মৌলভী আব্দুল হামিদের কাছ থেকে দুই দফায় ১৫ লাখ টাকা। শীলবনিয়া পাড়ার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীর বাড়ি নির্মাণে বাধা দিয়ে ৫ লাখ টাকা। মাঠ পাড়ার মোহাম্মদ হোছন থেকে ৪০ লাখ টাকা। উত্তর লম্বরী ফিরোজ মিয়ার (বাট্টু) থেকে ৪ লাখ টাকা। উত্তর লম্বরী জামালের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। উত্তর লম্বরীর সৈয়দ মিয়ার থেকে ৫ লাখ টাকা। দক্ষিণ লে্গুরবিলের এনামের কাজ থেকে ৫ লাখ টাকা। সদর চেয়ারম্যান শাহজাহান থেকে ২৫ লাখ টাকা। সেন্টমার্টিন পূর্বপাড়ার আজিমের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা। শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার ইসমাইলের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা সাবরাং মন্ডলপাড়ার এজাহার মিয়ার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা, একই এলাকার জামালের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা, লে্গুরবিল এলাকার ইউনুচ থেকে ৭ লাখ টাকা আদায় করেন। সবাইকে ক্রস থেকে রক্ষা করে কম-বেশি ইয়াবা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

পর্যটন বাধাগ্রস্ত করতে মেরিন ড্রাইভে পরিকল্পিত ক্রসফায়ার হতো কি না এবং ওসির বিরুদ্ধে উঠে আসা সব অপকর্ম সম্পর্কে জানতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনের সরকারি মুঠোফোনে কল করা হয়। তিনি ফোন না ধরায় বক্তব্য জানা যায়নি।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত