নারায়ণগঞ্জে টাকা দিলেই গ্যাসের অবৈধ সংযোগ

শত শত ঠিকাদার রাতারাতি কোটিপতি, অবৈধ সংযোগের মূল হোতা কতিপয় ইউপি চেয়ারম্যান
নারায়ণগঞ্জে টাকা দিলেই গ্যাসের অবৈধ সংযোগ
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস লাইনের ছড়াছড়ি। ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জে কতিপয় ঠিকাদার গত চার দশকে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। ’৭৫-পরবর্তী সময় থেকে এই অবৈধ সংযোগ দেওয়া বৃদ্ধি পায়। তিতাস নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক অফিস মানেই টাকা ছাড়া কাজ হয় না। বিগত ১/১১-এর সময় জনৈক এমরান অবৈধ গ্যাস-সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সেনাসমর্থিত সরকার তাকে চিহ্নিত করে। এছাড়া নামে-বেনামে তিতাসের কয়েক শ ঠিকাদার রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ রি-রোলিং স্টিল মিল ও ডায়িং ফ্যাক্টরিসহ সিদ্ধিরগঞ্জের চুনা ফ্যাক্টরিগুলোতে চোরাই গ্যাসের লাইন এখন যেন ওপেন সিক্রেট। তাছাড়া এভাবে অবৈধ সংযোগ নেওয়ায় সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক অফিসে বৈধ লাইন পেতে হয়রানির শিকার হলেও পয়সা দিয়ে অবৈধ লাইন পেতে ভোগান্তি তেমন হয় না। তিতাস গ্যাস অফিস সূত্রে জনা যায়, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্যাস-সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হলেও গত ১০ বছরে পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৭৯ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ নেওয়া হয়েছে। যার গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২ লাখ।

তবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মোহাম্মদ আল মামুন জানিয়েছেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। সেখানে নারায়ণগঞ্জকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিতাসের পক্ষে এককভাবে এই বিশাল কাজটি করা কষ্টসাধ্য। তাই এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

গত দুই বছর তিতাস কর্তৃপক্ষের অভিযানে বিচ্ছিন্ন হওয়া অবৈধ গ্যাসলাইনের সংখ্যাই বলে দেয় বন্দর উপজেলায় কী পরিমাণ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনেই জেলার রূপগঞ্জ ও বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের ১১ হাজার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে তিতাসের ভ্রাম্যমাণ আদালত। আর চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার এবং ১৯ আগস্ট শুধু বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়নেরই ৬ হাজার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ গ্যাস-সংযোগের মূল হোতা কয়েক জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। এসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যানদের অনুমতি ছাড়া বৈধ বা অবৈধ যে কোনো গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার ক্ষমতা খোদ তিতাসের কর্মকর্তাদেরও নেই। এছাড়া বন্দর সিটি করপোরেশনের ৯টি ওয়ার্ডে গ্যাস-সংযোগের তদারকিতে আছেন স্থানীয় কাউন্সিলর ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

এসব স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে রাতের আঁধারে পুরো বন্দর উপজেলায় হাজার হাজার বাড়িতে অবৈধ গ্যাসলাইনের সংযোগ দেওয়া হয়েছে গত কয়েক বছরে। প্রতি গ্যাস-সংযোগের জন্য প্রতিটি বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রের সদস্যরা। বন্দর উপজেলার মুসাপুর ও ধামগর ইউনিয়নের গোকুলদাসেরবাগ, কুটিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মাটির ওপর দিয়ে প্লাস্টিকের পাইপ, জরাজীর্ণ লোহার পাইপ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নেওয়া হয়েছে গ্যাসলাইনের সংযোগ। উপজেলায় অবৈধ গ্যাস-সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বন্দর ও কলাগাছিয়া ইউনিয়ন। এই দুটি ইউনিয়নেই রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার অবৈধ লাইন।

সোনারগাঁও পৌর এলাকা ছাড়াও ১০টি ইউনিয়নের এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেই। আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক যেকোনো গ্যাস-সংযোগ নিতে হলে স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। জানা গেছে, পুরো বন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১০ হাজার বৈধ গ্রাহকের জন্য ৪, ৩, ২ ও ১ ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ লাইন রয়েছে। এসব লাইন থেকে অবৈধ উপায়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংযোগ। অন্যদিকে, কোনো কোনো লাইন পরিত্যক্ত হলেও তাতে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত