জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যার আসামি এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা!

জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যার আসামি এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা!
মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সি।ছবি: ইত্তেফাক

বাংলা ভাইয়ের একান্ত সহযোগী জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি খোলস বদলে মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সি (৩৬) এখন নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক। এক সময়ের জেএমবি ক্যাডার কি করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে পদ বাগিয়ে নিয়েছে তা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন ও সমালোচনা।

বহুল আলোচিত কাজী বেলাল হোসেন ওই উপজেলার বড়গাছা ইউনিয়নের গহেলাপুর গ্রামের বড়িয়াপাড়ার নাজিম উদ্দীনের ছেলে।

বেলাল নিজ শিক্ষকের সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে ২০০৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিকাহ রেজিস্ট্রার হলেও তদন্তে ধরা পড়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সেই লাইসেন্স বাতিল করে এবং এ নিয়ে আদালতে নিয়মিত মামলা হয়, যা বর্তমানেও চলমান।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বেলাল হোসেন রাণীনগর আল-আমিন দাখিল মাদ্রাসার ছাত্র থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে রাণীনগর-আত্রাইয়ে আর্বিভাব হওয়া বাংলা ভাইয়ের দলে যোগ দিয়ে এলাকায় আনন্দ উল্লাসের সাথে প্রকাশ্য হত্যা ও লুটপাটসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। এক পর্যায়ে বাংলা ভাইয়ের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী তৎকালীন রাণীনগর উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা ইদ্রিস আলী খেজুরকে সিম্বা গ্রামের তার বড় বোন রেনুকা বেগমের বাড়ি থেকে ২০০৪ সালের ১৮মে সকাল ১০ দিকে প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এরপর উপজেলার ভেটি মাদ্রাসার পাশে ধানের জমির মধ্যে লাশ পুঁতে রাখে। এ ঘটনায় নিহতের বোন মোছা. লিলিমা আক্তার বাদী হয়ে রাণীনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩১ মার্চ চার্জশিট প্রদান করেন। চার্জশিটে অন্যান্য আসামিসহ মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সিকে ২৪ নম্বর পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অপরদিকে খেজুরের বোন লিলিমা আক্তার ২০০৮ সালে আদালতে যে নারাজি পিটিশন দাখিল করে সেখানেও বেলালের নাম উল্লেখ করা হয়।

নিহত ছাত্রলীগ নেতা ইদ্রিস আলী খেজুরের বোন লিলিমা আক্তার বলেন, ‘বাংলা ভাইয়ের পতন হলে ঘাপটি মেরে থেকে তৎকালীন সরকারের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে গা বাঁচিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পর্যন্ত দিন পার করে বেলাল। পরবর্তীতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে খোলস পাল্টিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সাথে প্রকাশ্য ঘোরাফেরা এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করে বেলাল। এক পর্যায়ে গোপনে আঁতাত করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছে। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছে। কিন্তু সরকার আমার ভাইয়ের হত্যাকারী বেলাল কাজীর এখন পর্যন্ত কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলো না। এটা খুবই দুঃখজনক।’

আরও পড়ুন: মাদারীপুরে তিনদিন ব্যাপী কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন

বেলঘরিয়া কাচারি গ্রামের ভুক্তভোগী আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় কাজী না হয়েও অবৈধভাবে বাল্যবিবাহ, ভুয়া তালাক, কাবিন জালিয়াতি, মরা মানুষের সাথে ভুয়া কাবিন নামা তৈরির মতো একের পর এক জঘন্য কাজ করে চলেছে। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। কাজী বেলাল প্রবাসে থাকা আমার স্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করে আমাদের মাঝে ছাড়াছাড়ি করিয়েছে। কিভাবে এটা সম্ভব তা আমার জানা নেই।’

এদিকে জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি তুলেছে সচেতন মহল। তাদের দাবি কার মাধ্যমে এবং কিসের বিনিময়ে তাকে দলে নেওয়া হলো তা দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার।

জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশীট ভুক্ত আসামি বিতর্কিত মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কেন ও কোন কারণে তাকে দলে নেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি নন বলে মুঠোফোনে জানান।

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘গত ২০১৭সালে যখন কমিটি গঠন করা হয় তখন তো আমি নিজেও একজন প্রার্থী ছিলাম। তাই কমিটিতে কাকে কোন পদ দেওয়া হচ্ছে তা জানা সম্ভব নয়। এটি নির্ধারণ করেন স্থানীয় সাংসদ, জেলা ও উপজেলার নেতৃবৃন্দ। তবে দলে এমন লোকের স্থান কাঙ্ক্ষিত নয়। কাজী বেলাল সম্পর্কে উপযুক্ত প্রমাণাদি পেলে দলের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত