মধুপুরে 'কাজু বাদামের ট্রায়াল প্লট': বনবিভাগ ও বনবাসীদের তুমুল বিরোধ

মধুপুরে 'কাজু বাদামের ট্রায়াল প্লট': বনবিভাগ ও বনবাসীদের তুমুল বিরোধ
মধুপুরে 'কাজু বাদামের ট্রায়াল প্লট', ইনসার্টে পূর্বের সাইনবোর্ড। ছবি: ইত্তেফাক

করোনাকালে কোটি টাকার মৌসুমি ফল ও মশলা ট্রাক্টরে পিষিয়ে সেই জমিতে বনায়ন ও কাজু বাদাম ট্রায়াল প্লট করার প্রতিবাদে এখন টালমাটাল টাঙ্গাইলের মধুপুর। বনবিভাগের বিরুদ্ধে সপ্তাহ জুড়ে চলছে স্থানীয় গারো ও বাঙ্গালীদের মানবন্ধন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মতো আন্দোলন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন বিভাগের কাজু বাদাম ট্রায়াল প্লট স্থাপন নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৬৮ সালে মধুপুর বনাঞ্চলের চাড়ালজানি সিলভিকালচার সেন্টারে ৫ একরে কাজু বাদামের একটি পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করে। ৮০ সালে প্লটের সফল সমাপ্তি ঘটে। বন গবেষকরা তাদের রিপোর্টে মধুপুর গড়ে কাজু বাদাম চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জানান। কিন্তু বনবিভাগ এখানে কাজু বাদাম চাষে কোন উৎসাহ দেখায়নি। ফলে মধুপুর গড়ে লাভজনক বা বাণিজ্যিকভাবে ভাবে কাজু বাদাম চাষের উদ্যোগে ভাটা পড়ে। তারপর কেটে গেছে ৩৮ বছর। টাঙ্গাইল বনবিভাগ ৮৮ সালে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের টাকায় গজারি বন কেটে ৭ হাজার একরে বিদেশী প্রজাতির একাশিয়া, মেনজিয়াম ও ইউক্যালিপটাস গাছের বাগান করেন। ২০০৩ সালে এ বাগানের পুরোটাই উজাড় হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বন বিভাগের ৪৫ হাজার একর বনভূমির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ এখন বেদখলে।

২০০৪ সালে ফরেস্ট্রি সেক্টর প্রকল্প, ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত টেকসই বনায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু বেদখল হওয়া ভূমি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। চলতি অর্থ বছরে বনবিভাগ ‘সুফল প্রকল্প’ গ্রহণ করেছে। জবরদখল হওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধারে নেমেছে। এ বনভূমি পুনরুদ্ধার নিয়ে স্থানীয় গারো ও বাঙ্গালীদের সাথে দেখা দিয়েছে সংঘাত।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং মধুপুর উপজেলার আমলিতলা গ্রামের বাসিন্দা ইমরুল কায়েস জানান, দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ গত ২৪ আগস্ট কয়েকজন বনকর্মী এবং ইউপি মেম্বার ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর রহমান মজিকে সাথে নিয়ে গ্রামের ফল বাগানের পাশে সিমেন্টের খুঁটিতে কাজু বাদাম চাষের একটি সাইনবোর্ড উঠান। এরপর ট্রাক্টর নামিয়ে বাগানের সকল আনারস মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। একইভাবে গ্রামের সাতজন গরীব চাষির প্রায় পাঁচ একর জমির আনারস, কলা, আদা ও হলুদ ট্রাক্টর দিয়ে জমিতে পিষে ফেলেন।

গ্রামবাসীরা জানান, এসব জমি তারা পঞ্চাশ বছর ধরে ভোগদখল করে আসছেন। কারো কারো জমির বৈধ কাগজপত্র ও রয়েছে। কিন্তু বনবিভাগ কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রায় দেড় কোটি টাকার ফল ও মশলা বিনষ্ট করেন। যাবার সময় বনকর্মীরা বলে যান, এসব জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে কাজু বাদাম চাষের প্রদর্শনী প্লট হবে।

ওই গ্রামের চাষি উমর আলী জানান, জমি বন বিভাগের হয়েও থাকলেও মানবিক কারণে আবাদ করা কোটি টাকার মৌসুমি ফল ও মশলা বাগান থেকে তুলে নেয়ার জন্য অন্তত এক দিনের সময় দিতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটা করেননি। এভাবে করোনার সময় দেশের সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার বন বিভাগ রাখে না।

এদিকে পার্শ্ববর্তী পেগামারি গ্রামের বাসন্তী রেমা নামক এক গারো রমণীর কলা বাগান কেটে সাবাড় করলে এলাকার গারো ও বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠে। এর প্রতিবাদে এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে তারা যৌথভাবে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধন বন অফিস ঘেরাও, হামলা, ভাংচুর এবং সড়ক অবরোধ করে। এমতাবস্থায় এলাকায় উত্তেজনার প্রেক্ষিতে বন কর্মীরা গত ২১ সেপ্টেম্বর আমলিতলা গ্রামের কাজু বাদাম প্রদর্শনী প্লটে স্থাপিত সাইনবোর্ড নামিয়ে অফিসে নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, প্রস্তাবিত কাজু বাদাম প্লটের সাইনবোর্ডে বানান ভুল থাকায় সেটি নামিয়ে ফেলা হয়েছে। কাজু বাদামের চারা কবে পাওয়া যাবে ঠিক নেই। বিএডিসি করোনার কারণে চারা দেয়নি। বাগান করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে চারা পাওয়া সাপেক্ষে বাগানের কাজ শুরু হবে। তখন আবার সাইনবোর্ড ঝুলানো হবে।

কাজু বাদামের চারা সংগ্রহ না করেই কেন কোটি টাকার ফলফসল বিনষ্ট করা হলো প্রশ্নে তিনি জানান, মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক বিষয়টির উত্তর দিতে পারবেন।

মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভিপ্রায়ে মৌসুমি ফল বাগান গুড়িয়ে সেখানে কাজু বাদাম চাষের প্রদর্শনী প্লট করা হবে। বেদখলি হলেও জায়গাটা বনবিভাগের। আমরা অভিযান চালিয়ে সেটি দখলে নিয়েছি মাত্র। কাজু বাদামের চারা সংগ্রহ না করেই প্রস্তাবিত প্রদর্শনী প্লটের নামে কোটি টাকার ফলফসল ধ্বংস ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া কিনা প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, মে-জুন কাজু বাদাম করার প্রকৃত সময়। এখন সেপ্টেম্বর চলছে। সুতরাং এ মৌসুমে আর কাজু বাদাম ট্রায়াল প্লট করা সম্ভব হবেনা বলে মনে হয়।

টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, কৃষি মন্ত্রী মহোদয় মধুপুরে কাজু বাদাম চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। এ জন্য পতিত বনভূমি খুঁজে একটি নমুনা প্লট করার কথা জানান। কিন্তু মধুপুরে কোন পতিত বনভূমি না থাকায় শেষাবধি বেদখলি বনভূমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে কাজু বাদামের ট্রায়াল প্লট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু নানা কারণে কাজু বাদামের এ ট্রায়াল প্লট হয়তো আর বাস্তবায়ন করা হচ্ছেনা।

তিনি আরো জানান, ২০১০ সালে এ জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে আগর বাগান করা হয়। কিন্তু বাগানটি সফল হয়নি। এ সুযোগে স্থানীয়রা এ জায়গা জবরদখল করে নেয়। কাজু বাদাম না হলে সুফল প্রকল্পের আওতায় এখানে বনায়ন করা হবে। 'মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্রের কাজু বাদাম চাষের বিস্তর গবেষণা রিপোর্ট থাকার পরও নতুন করে গবেষণার জন্য প্রদর্শনী প্লট কেন?'- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ওই রিপোর্ট নিয়ে তার কোন ধারনা ছিলনা।

বন গবেষণা কেন্দ্র খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এহিয়ুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রির সাবেক অধ্যাপক কামালউদ্দীন আহমদ মধুপুর বনাঞ্চলের চাড়ালজানি সিলভীকালচার কেন্দ্রের পাঁচ একর কাজু বাদাম প্রদর্শনী প্লটের গবেষণা পত্র ১৯৮০ সালে ‘বনবিজ্ঞান পত্রিকা’ এর নবম সংখ্যায় প্রকাশ করেন। তার গবেষণা প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল, 'cashew- a promising species for the sungrass infested areas of bangladesh'। সেখানে বলা হয়, মধুপুর গড়ের মাটি ও আবহাওয়া কাজু বাদাম চাষের খুবই উপযোগী। গাছের বাড়বাড়ন্ত ফলের উৎপাদন সন্তোষজনক।

দেশের বিখ্যাত বনবীদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন জানান, মধুপুরে কাজু বাদাম নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এটি নিয়ে নতুন করে ট্রায়াল প্লট বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনই প্রয়োজন নেই। তিনি জানান, বহুবার মধুপুর সিলভীকালচার সেন্টারের পরীক্ষামূলক ভাবে স্থাপিত কাজু বাদাম প্রকল্পের বাগান সরেজমিন দেখেছেন। নিজেও গবেষণা করেছেন। সন্তোষজনক ফলাফল হাতেনাতে পেয়েছেন।

মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এডভোকেট ইয়াকুব আলী জানান, কৃষি মন্ত্রী সাহেবের কোন পরামর্শ ছাড়াই অতি উৎসাহী বনকর্মীরা কাজু বাদাম ট্রায়াল প্লটের নামে সাইনবোর্ড উঠান। খবর পেয়ে তিনি বনকর্মীদের উপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফলে বনকর্মীরা সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলে।

এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক স্থানীয় মিডিয়া কর্মীদের জানান, আদিবাসী গারো ও বাঙ্গালীদের উচ্ছেদ করে অথবা ফল বাগান ধ্বংস করে কাজু বাদাম বা বনায়ন করার কোন অভিপ্রায় তিনি ব্যক্ত করেননি। এমন কোন পরামর্শ বনবিভাগকে দেয়া হয়নি।

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত