অসময়ে কাজুবাদামের জন্য ফলবাগান ধ্বংস

ক্ষোভে ফুসছে মধুপুরের গারো ও বাঙালিরা

ক্ষোভে ফুসছে মধুপুরের গারো ও বাঙালিরা
ছবি: সংগৃহীত

কাজুবাদাম চাষে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের জমির জন্য ধ্বংস করা হয়েছে কোটি টাকার মৌসুমি ফলের বাগান। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুরে এ কাণ্ড ঘটিয়েছে বন বিভাগ। স্থানীয় গারো ও বাঙালি সম্প্রদায় বন বিভাগের এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসছে। ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বয়ং কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে বনায়ন করতে এবং ফল-ফসল নির্বিচারে ধ্বংস করে কাজুবাদামের নমুনা প্লট করার জন্য বন বিভাগকে বলা হয়নি। এটি নিয়ে মিথ্যাচার হচ্ছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৬৮ সালে মধুপুরের চাড়ালজানি সিলভি কালচার সেন্টারে পাঁচ একর জমিতে কাজুবাদামের পরীক্ষামূলক বাগান করে। ১৯৮০ সালে দুই জন বন গবেষক তাদের রিপোর্টে এখানে কাজুবাদাম চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান।

সম্প্রতি বন বিভাগ সুফল প্রকল্পের আওতায় বনভূমি পুনরুদ্ধারের নামে গারো ও বাঙালিদের ফলবাগান ধ্বংস করেছে। একসময় বন বিভাগের ৪৫ হাজার একর বনভূমি ছিল। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেদখলে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমলিতলা গ্রামের ইমরুল কায়েস জানান, বনকর্মীরা গত ২৪ আগস্ট গ্রামের ফলবাগানে সিমেন্টের খুঁটি পুঁতে কাজুবাদাম চাষের সাইনবোর্ড টানান। তারপর ট্রাক্টর দিয়ে পাঁচ একর জমির প্রায় দেড় কোটি টাকার আনারস, কলা, আদা ও হলুদ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। বলা হয়, জমিতে কাজুবাদাম চাষের প্রদর্শনী প্লট হবে।

গ্রামের উমর আলী জানান, জমি বন বিভাগের হলেও আবাদ করা কোটি টাকার ফসল এভাবে ধ্বংস করার অধিকার বনকর্মীদের নেই। বনায়নের নামে পেগামারির বাসন্তী রেমার কলাবাগান কেটে সাবাড়ের পর সপ্তাহ জুড়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধন, বন অফিস ঘেরাও, হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে বনকর্মীরা গত ২১ সেপ্টেম্বর কাজুবাদাম প্রদর্শনী প্লটের সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলেন।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, কাজুবাদাম প্লটের সাইনবোর্ডে বানান ভুল থাকায় নামিয়ে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া কাজুবাদামের চারাও পাওয়া যাচ্ছে না। চারা সংগ্রহ না করেই কোটি টাকার ফসল কেন নষ্ট করা হলো—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সহকারী বন সংরক্ষক এর উত্তর দিতে পারবেন।

মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদার জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইচ্ছায় কাজুবাদামের ট্রায়াল প্লটের জন্য ফলবাগান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মে-জুন মাস চারা রোপণের সময়। এখন সেপ্টেম্বর, তাই চারা রোপণ হচ্ছে না। তাহলে ট্রায়াল প্লটের নামে কোটি টাকার ফসল কেন নষ্ট করা হলো—এমন প্রশ্নে জানান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এটি বলতে পারবেন।

টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, কৃষিমন্ত্রী মহোদয় কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। তিনি পতিত বনভূমিতে নমুনা প্লট করতে বলেন। কিন্তু পতিত বনভূমি না পাওয়ায় ফলবাগান উচ্ছেদ করে ট্রায়াল প্লট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রায়াল প্লট আপাতত হচ্ছে না। বন গবেষণা কেন্দ্রের কাজুবাদাম চাষের বিস্তর গবেষণা রিপোর্ট আস্থায় না নিয়ে কেন নতুন ট্রায়াল প্লট—এ প্রশ্নে জানান, ঐ রিপোর্ট সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না।

খুলনার অবসরপ্রাপ্ত বন গবেষক এহিয়ুল ইসলাম জানান, প্রখ্যাত বনবিদ অধ্যাপক কামালউদ্দীন আহমদ ১৯৮০ সালে মধুপুর বনাঞ্চলের কাজুবাদাম প্রদর্শনী প্লটের গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন জানান, মধুপুরে কাজুবাদাম চাষের ওপর নতুন করে ট্রায়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই। মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী জানান, আগ বাড়িয়ে কৃষিমন্ত্রীর নামে কাজুবাদামের সাইনবোর্ড ওঠানো-নামানো করায় তিনি বনকর্মীদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত