শতাব্দীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে ডুবে গেছে রংপুর

ফুলে-ফেঁপে উঠেছে উত্তরের নদনদী
শতাব্দীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে ডুবে গেছে রংপুর
বৃষ্টিতে ডুবে গেছে রংপুর। ছবি : দৈনিক ইত্তেফাক

টানা চার-পাঁচ দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে। রংপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় শতাব্দীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কুড়িগ্রামে বছরের সর্বোচ্চ ২৭৪ মিলিমিটার ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে বছরের সর্বোচ্চ ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ঐসব অঞ্চলের নদনদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। নদনদী উপচে পানি ঢুকছে লোকালয়ে। নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, গাইবান্ধা, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের হাজার হাজার হেক্টর জমির রোপা আমনসহ অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে। আমন ধান ছাড়াও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মরিচ, বেগুন, চিনাবাদাম, মাষকলাইয়ের ডালসহ বিভিন্ন ফসলের।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর : ১০০ বছরের ইতিহাসে রংপুর জেলায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতে ডুবে গেছে শহরের অধিকাংশ পাড়া-মহল্লা। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে সড়কসহ বাড়িঘর ও স্থাপনা। আকস্মিক পানির কবলে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরীর সাধারণ মানুষ। রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয়রা। হঠাত্ করে এভাবে জলাবদ্ধতায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে রংপুরের বাসিন্দাদের। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে মূল্যবান কাগজপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও ব্যাবসায়িক মালামাল, জিনিসপত্র ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিও নষ্ট হওয়ার পথে। বিশেষ করে যারা একতলা বাড়িতে থাকেন তাদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। এলাকাবাসী জানান, এত বড় একটি দুর্যোগে আগে থেকে সিটি করপোরেশন অথবা আবহাওয়া অফিস কেউই কোনো সতর্কবাণী বা পূর্বাভাস দেয়নি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরজাহান বলেন, আমি ছোট ব্যবসায়ী। ভাড়া বাড়িতে থাকি। হঠাত্ এই পানিতে মালামালসহ বাড়ির সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসারের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেল।

নগরীর বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। শুকনা খাবার ও নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নগরীর পানিবন্দিদের উদ্ধারে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি টিম। তারা নৌকায় করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, এর আগে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ছিল ২৬৭ মিলিমিটার। এ ধারা আরো দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গাচড়ার ৯টি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মর্নেয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী আজাদ বলেন, বৃষ্টিপাতের মর্নেয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২০০ ফিট সীমানা প্রাচীর ভেঙে গেছে।

নওগাঁ : গত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আত্রাই, রাণীনগর ও মান্দায় আত্রাই নদের বাঁধের ভাঙা অংশের মেরামত সম্পন্ন না হওয়ায় ঐ অংশ দিয়ে হুহু করে লোকালয়ে পানি ঢুকে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। আগের বন্যার ক্ষতি এখনো কাটাতে পারেননি কৃষক। দ্বিতীয় দফায় রোপণকৃত আমনের ধান আবার তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। নওগাঁয় চতুর্থ দফায় বন্যায় আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শিমুলতলী পয়েন্টে আত্রাই নদের পানি বিপত্সীমার ৭৫ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই-তিন দিন পানি আরো কিছুটা বাড়বে।

মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান জানান, ‘ভাঙনস্থান মেরামতের জন্য তার দপ্তর থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে আবেদন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেগুলো মেরামত করে দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিল। পাউবোর আশ্বাস পেয়ে দুর্গত এলাকার কৃষকদের আমন ধানের চারা রোপণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো ভাঙনস্থান মেরামত না হওয়ায় বন্যার পানিতে ঐসব এলাকায় প্রায় সাড়ে ৭০০ হেক্টর বিঘা জমির আমন ধান তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকরা আবারও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেন।’

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামছুল ওয়াদুদ জানান, চতুর্থ দফায় বন্যায় আত্রাইয়ে ১ হাজার ৫৫ হেক্টর, মান্দায় ৭৫৫ হেক্টরসহ জেলায় ৩ হাজার ২১৪ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও সবজির খেত তলিয়ে গেছে। গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে নওগাঁ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন, চতুর্থ দফার বন্যা একটু আগাম হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে ভাঙনস্থানগুলো মেরামত করা সম্ভব হয়নি।

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) : কুলিক নদীর পানিতে নদীপাড়ের কুলিকপাড়াসহ উপজেলার আমজুয়ান, লেহেম্বা, কোচল শিংপাড়া ও আরো কিছু নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার কাঁচা বাড়িঘর, মালামাল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) : উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া টাঙ্গন, লাছি, চন্দনা, কাহানাই, বাগডারাসহ ছোট-বড় সব নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে শতাধিক হেক্টর জমির ফসল ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বন্যায় ধান, মরিচ, বেগুনসহ সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) :যমুনার পানি কমলেও বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার কাজলা, চালুয়াবাড়ী, সারিয়াকান্দি, হাটশেরপুর, কর্নিবাড়ী, বোহাইল, কুতুবপুর, ভেলাবাড়ী ও নারচী ইউনিয়নের ৩৮৫ হেক্টর জমির রোপা আমন, মাসকলাই, শাকসবজি ও মরিচের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। চরাঞ্চলে নদী ভাঙনে তিন শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম : রবিবার বিকালে ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে ২৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা এই বছরে সর্বোচ্চ।

কুড়িগ্রাম কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক শামসুজ্জামান মিয়া জানান, পঞ্চম দফা বন্যায় ১৬ হাজার ৭৭৯ হেক্টর ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমন ১৫ হাজার ৬৯৭ হেক্টর, মাসকালাই ৬৫৪ হেক্টর, শাকসবজি ৩৫০ হেক্টর এবং চিনা বাদাম ৮০ হেক্টর। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, ধরলাসহ অন্যন্য নদনদীতে পানি আরো দু-একদিন বাড়বে। তবে বড় ধরনের বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই।

জলঢাকা (নীলফামারী) :তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়নের ৭ হাজার ১৬ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ১২০ হেক্টর জমির ফসল।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) : শহরের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মিস্ত্রিপাড়া, নিচুকলোনী, হাতিখানা, মাছুয়াপাড়া, কয়ানিজপাড়া, বাঁশবাড়ী ও কুন্দল এলাকায় বাসা-বাড়িতে পানি উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ অঞ্চলে ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। যা এ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। খড়খড়িয়া নদীর পানি বিপত্সীমার ৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বাগমারা (রাজশাহী) : প্রবল বর্ষণের ফলে ফুলেফেঁপে উঠেছে ফকিরানী ও বারনই নদীর পানি। এতে এই নদীর তীরবর্তী এলাকার বিভিন্ন খালে-বিলে নদীর পানি প্রবেশ করছে। ফলে বিল এলাকার বিভিন্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চলসমূহ এরই মধ্যে প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

আটোয়ারী (পঞ্চগড়) :উপজেলার বেশির ভাগ এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধা :গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ঘাঘট ও আখিরা নদীর পানি গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে রোপা আমন ধান ও শাকসবজি ক্ষেত।

ইত্তেফাক/এএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত