বেহুলা ও লখিন্দর লোকপালা যমুনা পাড়ের সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই

বেহুলা ও লখিন্দর লোকপালা যমুনা পাড়ের সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই
[ছবি: ইত্তেফাক]

মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের মঙ্গল কাব্য ধারার রসঘন পদাবলী হচ্ছে পদ্মপুরাণ ও মনসা মঙ্গল। ত্রয়োদশ শতকের কবি কানাহর দত্ত নিজেও হয়তো অনুমান করেননি বেহুলা কেন্দ্রিক তার অমর কাব্য এতো যুগোত্তীর্ণ হবে। মধ্যযুগ পেরিয়ে ডিজিটাল যুগেও পালাগান হয়ে বাঙ্গালী মানসে টিকে থাকবে শত শত বছর। টাঙ্গাইলের যমুনা পাড়ের জনপদে বাঙ্গালীর আবহমান সংস্কৃতির আদলে শেকড় গেড়ে বসা বেহুলা আজ সে কথাই স্মরণ সকলকে করিয়ে দেয়।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘বাংলায় বহু মনসামঙ্গল কাব্য পাওয়া গেছে। এসব কাব্য পশ্চিম বঙ্গে মনসা মঙ্গল আর পূর্ব বঙ্গে পদ্মপুরাণ নামে খ্যাত।’ পদ্মপুরাণ আখ্যানটি আবর্তিত হয়েছে মর্ত্যলোকে মনসার পূজা নিয়ে। চম্পক নগরের ক্ষমতাশালী বণিক চাঁদ সওদাগরের উপর দেবী মনসার অত্যাচার, চাঁদপুত্র লখিন্দরের সর্পাঘাতে মৃত্যু ও পুত্রবধূ বেহুলার আত্মত্যাগের করুণ উপাখ্যানে মানবিক আবেদন থাকায় আজো বাঙ্গালী সমাজে বেহুলা সমান জনপ্রিয়।

মনসা মূলগতভাবে অনার্য দেবী। আদিবাসী অন্ত্যজ সমাজে সর্পদেবী মনসার পূজা প্রচলিত। কালক্রমে মনসা ব্রাহ্মণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিপত্তি অর্জন করে। সাতশ বছরে বেহুলা কাব্যের কঠিন ছন্দবৃত্ত প্রথমে কথক এবং পরে পালা সুরে বিবর্তন লাভ করেছে। এর আবেগঘন সুর ও পয়ারের ছন্দে ভিন্ন মাত্রা ছড়িয়েছে অঞ্চল ভেদে। দেশের অন্যতম পলল ভূমি যমুনা চত্বর। গাঙ্গেয় বেসিনের বাইরে অবস্থান যমুনার।

১৭৮৭ সালে এক ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথকে পরিষ্কার করে রূপ নেয় নব যমুনায়। যমুনা আদতে ব্রহ্মপুত্রের নতুন ধারা। নবসৃষ্ট যমুনার দৈর্ঘ্য ৫১ কিলোমিটার। জনবসতি গড়ে উঠে উনবিংশ শতাব্দীতে। কাজেই এ জনপদে বেহুলার আগমন খুব বেশি দিনের নয়। বেহুলার কাহিনী যেহেতু নদীমাতৃক তাই নব সৃষ্ট যমুনা চত্বরের নরম মাটিতে কাঁচা সোনার মতো শেকড় গেড়ে বসে বেহুলা। উজানে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে ভাটিতে পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থল গোয়ালন্দঘাট পর্যন্ত যমুনার উভয় পাড়ের জনমানসে সংস্কৃতির পট নিয়ে স্থায়ী হয়ে যায় বেহুলা।

টাঙ্গাইল জেলার যমুনা অববাহিকায় ২৫টি বেহুলা লাচারী দল রয়েছে। কয়েকবার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছে গোপালপুর উপজেলার শাখারিয়া বেহুলা দল। পঞ্চাশের দশকে দলের প্রতিষ্ঠা করেন হেমনগর জমিদারের শেষ নায়েব ও স্বভাব কবি গণেশ রক্ষিত। গানের নতুন সুরারোপে, ভিন্ন মাত্রার নৃত্য ও বাদ্যে, সুখপ্রিয় পয়ার বর্ণনায়, ব্যতিক্রম উপস্থাপনায় এবং শৈল্পিক আঙ্গিক সৌষ্ঠবে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া পেয়েছে দল। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ডিজিটাল বেহুলা।

দলের ম্যানেজার রিপন হোসেন জানান, সারা বছর বেহুলা লাচারী হলেও বর্ষাকালে এর কদর বেড়ে যায়। এ সময়ে মানুষের হাতে কাজ থাকেনা। তখন গ্রামে গ্রামে চলে এর মঞ্চায়ন। দলে একজন ওঝা থাকেন। সাপেকাটা রোগীর বিষ দাওয়াই দিয়ে সুস্থ করে তোলেন দলের ওঝা। তখন রোগীকে ঝাড়া দেয়ার অছিলায় টানা তিন দিন পর্যন্ত চলে বেহুলা লাচারী গান। সাপের দংশনে অনেক রোগীকে এভাবে তারা ভালো করে তুলেছেন বলে দাবি তার। টাঙ্গাইল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা রাতের বেলা বেহুলা পালা মঞ্চস্থ করেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দল টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

লখিন্দর চরিত্রে অভিনেতা মিজান জানান, বেহুলা গানের যে আদিসুর সেটির অঞ্চল ভেদে রয়েছে বহুমাত্রিকতা। তারা প্রাচীন কথন ও সুরকে ঘষেমেজে সংস্কার করেছেন। রসাত্মক ও বিরহের কাহিনী অক্ষুণ্ণ রেখে পয়ার ও ছন্দে অভিনবত্ব এনেছেন।

দলের অভিনেতা খোকন জানান, দলের ২৫ শিল্পীর সবাই দরিদ্র। নানা টানাপড়েন স্বত্বেও বংশ পরস্পরায় এ পালা সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন। দল টেকাতে অনেক শ্রম, অর্থ ও সময় ব্যয় হয়। কিন্তু কোন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন না।

দলের পৃষ্ঠপোষক এবং স্কুল শিক্ষক আঞ্জু আনোয়ারা ময়না জানান, বেহুলা বাংলার লোক সংস্কৃতি, লোকপালা এবং লোকগীতির ভাণ্ডার।

প্রতি বছর শ্রাবণ সংক্রান্তিতে এ দল গাঙ্গে ভেলা ভাসায়। এরপর চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকরের আদলে নৌকা সাজিয়ে শাওনী ডালাকে মধ্যমণি করে নেচে গেয়ে যমুনার পাড়কে মাতিয়ে তোলেন তারা। হাজারো মানুষ সেদিন অনুষ্ঠানে জড়ো হন। তবে বেহুলা লাচারী ও ওঝার ঝাড়ফুঁকে সর্পদংশনের রোগী ভালো হয় বলে তিনি মনে করেন না।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা কালচারাল অফিসার খন্দকার রেজোয়ানা ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বক্তব্য দিতে পারবেন না বলে জানান।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত