পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল সিলেট

পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল সিলেট
ছবি: ইত্তেফাক

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ‘পুলিশী নির্যাতন’-এ যুবক রায়হান হত্যা ঘটনার মূলক নায়ক এসআই আকবর হোসেন এখন কোথায় ?-এই প্রশ্ন এখন সিলেটের ঘরে ঘরে। সিলেটবাসী বলেছেন রায়হান হত্যা ঘটনার পাঁচদিন অতিবাহিত হলেও আকবরকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না।

এদিকে এসআই আকবরকে নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। কেউ বলছেন, আকবর ভারতে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ বলছেন, আকবরকে কর্মকর্তারাই লুকিয়ে রেখেছেন। পুলিশ বলেছে, আকবরের খুঁজে আশুগঞ্জের বেড়তলা গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এসএমপির কমিমশনার গোলাম কিবরিয়া বলেছেন, আকবর যাতে পালাতে না পারে সে জন্য সব কটি ইমিগ্রেশনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অবহিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শুক্রবারও বাদ জু‘মা সিলেটের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে ‘পুলিশি নির্যাতন-এ’ রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে ¯স্লোগানে মুখরিত ও উত্তাল হয়ে উঠে নগরী। এসময় বন্দরবাজার পুলিশ ফাড়ির গেটে পুলিশের বিশেষায়িত দল সিআরটি টিমকে প্রস্তত রাখা হয়। কোর্ট পয়েন্টে উলামা পরিষদ সিলেট, উলামা মাশায়েখ পরিষদ সিলেট ও ইসলামি ঐক্যজোট এবং সমমনা দলগুলো রায়হান হত্যাসহ দেশব্যাপী খুন, ধর্ষণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদে মিছিল এবং মানববন্ধন করে। সমাবেশে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধূরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধূরী নাদেল, সিটি কাউন্সিলার কয়েস লোদি সহ বিশিষ্টজনরা বক্তব্য রাখেন। দায়িদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় না আসা পর্যন্ত অন্দোলনরত সিলেটের সর্বস্থরের জনতা ঘরে ফিরবেন না বলে জানালেন।

টাকার জন্য শিশুকে পিতৃহারা-এটা মানা যায় না:

রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, টাকার জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলা। এটা মানা যায়না। তিনি বলেন, শান্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সিলেটবাসী রায়হান পরিবারের সঙ্গেই থাকবে।

সুদর্শন চেহারার আড়ালে আকবরের ভয়ঙ্কর হৃদয়:

এদিকে সুদর্শন চেহারার আড়ালে এসআই আকবর যে এই ফাঁড়ির একজন ভয়ঙ্কর পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন-তার মুখোশ এখন ধীরে ধীরে উন্মুচিত হচ্ছে। কঠিন হৃদয়ের আকবর টাকার জন্য সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে পেটাতেন। অবৈধ টাকার পাহাড় গড়াসহ নানা অপকর্মের কাহিনী এখন মুখে মুখে। বন্দরবাজার এলাকার ফুটপাত, ভাসমান হকার সহ নানা শ্রেণীর মানুষের বিশাল অংকের টাকা প্রতিমাসে তার পকেটে যেতো। সেই টাকায় তার নায়কোচিত চলাফেরা, আশুগঞ্জে গ্রামের বাড়ির অট্রালিকার ছবি এখন মিডিয়ায় ভাসছে। পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগটি এখন অনেকটাই খোলাসা হয়ে আসছে।

ওসমানী হাসপাতালের ফরেন সিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের প্রাথমিক অভিমত, পার্শ্ববর্তী হোটেলের এক বর্ডারের শুনা আর্তচিৎকার, প্রত্যক্ষদর্শী সিএনসি অটোরিকশা চালকের বর্ণনা ইত্যাদি অনেকটাই প্রমাণ করে রায়হানকে নির্যতন করে হত্যা করা হয়। গত রবিবার এসআই আকবরকে বরখাস্ত ও অন্যদের প্রত্যাহার করার পর অনেকেই পুলিশ লাইনে থাকলেও ঘটনার মূল হোতা আকবর লাপাত্তা। মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান,রায়হানের মৃত্যুর ঘটনার পর পরই গা-ঢাকা দেয় আকবর। তার আগে সে খুনের সব আলামত নষ্ট করে দিতে বন্দর ফাঁড়ির সিসিটিভির ফুটেজও মুছে দেয়া হয়। এ কারণে ‘ ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে’ রায়হান নিহত -এই কথা পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী এসপি অফিসের সিসিটিভির ফুটেজে ঘটনা ধরা পড়লে আকবরের সহযোগী এক পুলিশ সদস্য ঘটনা স্বীকার করে।

রায়হান ফাঁড়িতে ঢুকলেন হেটে, বের হলেন দুই পুলিশের কাঁধে ভর করে:

সিসি টিভির ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ৩টার পর সিএনজি অটোরিকশা যোগে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয় হাককড়া পরিয়ে যুবক রায়হানকে। তখন তিনি সিএনজি থেকে নেমে নিজেই হেঁটে হেঁটে পুলিশের সঙ্গে ফাঁড়িতে ঢুকেন। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে যখন রায়হানকে ফাঁড়ি থেকে বের করা হয় তখন তার দুই হাত ছিল দুই কনস্টেবলের কাঁধে। পা টেনে টেনে সিএনজি অটোরিকশাতে তোলা হয় রায়হানকে।

আলমত নষ্ট করেছেন আকবর:

ঐ সময় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর ভূঁইয়াও সেখানে ছিলেন। কিন্তু ঘটনার দিন সকাল থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্ছেনা। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ-বলে জানান ঐ কর্মকর্তা। এই ঘটনায় ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে এ বিষয়ে মামলা হলে মহানগর পুলিশ পিবিআইয়ের কাছে মামলা হস্তান্তর করে। পিবিআই ফাঁড়ি পরিদর্শন করে নিহত রায়হানের মৃতদেহ আরেক দফা ময়নাতদন্ত করিয়েছে। ইতিমধ্যে আকবর সম্পর্কিত অনেক তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। আকবর ঘটনার দিন দুপুর পর্যন্ত সাদা পোশাকে ফাঁড়িতেই ছিলেন। ওই সময়ের মধ্যে সে ফাঁড়ির সিসিটিভি ক্যামেরাও ফুটেজ নষ্ট করে ফেলে। এমনকি হার্ডডিস্কও সরিয়ে নতুন হার্ডডিস্ক বসানো হয়। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটির কাছে, উপস্থিত থাকা পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, আকবরের নেতৃত্বেই ধরে আনা যুবক রায়হানকে নির্যাতন করা হয়। সে সময় আকবর সেখানে ছিল। যখন রায়হানকে নির্যাতন করছিল পুলিশ সদস্যরা তখন আকবর নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্যকে বাহবা দেন।

ঘটনার দিন রাতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ রায়হানকে আটক করে কাস্টঘরের সুইপার কলোনির একটি ঘর থেকে। এরপর লোকজনের সামনেই তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আনা হয় থানায়। থানায় নিয়ে আসার পর ১০ হাজার টাকার জন্য তার পায়ের নখ উপড়ে ফেলাসহ নানা নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের সময় ফাঁড়ির ভেতর থেকে আর্তনাদ শুনতে পান প্রতিবেশীরা।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত