‘পুলিশি নির্যাতন’ এ রায়হানের মৃত্যু: এসআই আকবর এখনো অধরা

মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ অব্যাহত 
‘পুলিশি নির্যাতন’ এ রায়হানের মৃত্যু: এসআই আকবর এখনো অধরা
রায়হান আহমদ।ছবি: সংগৃহীত

সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার ছায়াঘেরা নেহারীপাড়া। টিনসেডের বাংলা পেটার্নের নিরিবিলি বাড়ির বাসিন্দারা এতদিন আনন্দ উল্লাসে স্বাভাবিক জীবনে আগামীর স্বপ্নের জাল বুনছিলেন। ‘পুলিশি নির্যাতন’-এ নিহত যুবক রায়হানের সেই বাড়িতে এখন শুধুই বিষন্নতা। ঘটনার পর থেকে শত শুভানুধ্যায়ীর আনাগোনা হলেও প্রাণ চাঞ্চল্যতা নেই। নেই কারো মুখে কথা। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা। আগন্তুকরাও বাকরুদ্ধ, ছলছল নয়ন। কিছু সময় পর পর শুধু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে মা সালমা বেগমের আহাজারি। রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তন্নীর কান্নার রোল। দুইমাস বয়সী শিশু কন্যা আলফা শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে থাকিয়ে থাকে আগন্তুকদের দিকে। এ যেন এক হৃদয় কাড়া দৃশ্যপট।

সহমর্মিতা জানাতে যারাই আসছেন-তাদের মনে একরাশ প্রশ্ন, মাত্র দশ হাজার টাকার জন্য পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে একটি তাজা প্রাণ কিভাবে কেড়ে নিলো নিলো। নিষ্ঠুর এ ঘটনার নায়ক এসআই আকবরকে সাতদিনের মাথায়ও পুলিশ কেন গ্রেফতার করতে পারছে না। আকবর গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। অপরাধ কর্মকাণ্ডের ‘রাজা’ বলে বহুল আলোচিত এই আকবর পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথায় পালালেন?-এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন রায়হানের পরিবারসহ সিলেটের সর্বস্থরের মানুষ ও সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

সুশীল সমাজের অনেকেই বলেছেন, একজন আকবরের দায় কেন গোটা পুলিকে বহন করতে হবে। এসআই আকবরসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করে পুলিশ বিভাগ দায় মুক্ত হোক।

এদিকে শনিবারও ‘পুলিশি নির্যাতনে’ নিহত রায়হান হত্যার বিচার ও অভিযুক্ত এসআই আকবরসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারের দাবিতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে নারীরা মানববন্ধন করেছেন। একই দাবিতে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানবন্ধন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবাদকারীরা বলেন, রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।

পুলিশের হেফাজত থেকে পুলিশ সদস্যের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নাটকের অংশ

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুলিশের হেফাজত থেকে পুলিশ সদস্যের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নাটকের একটি অংশ। তিনি প্রশ্ন করে বলেন-এখন নিরাপত্তা কোথায় রয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পক্ষপাতিত্ব আচরণ করেছেন পুলিশেরই সঙ্গেই। বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সদস্য ও এসআই আকবরকে তারাই পালাতে সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা পুলিশের ব্যর্থতা। উদাসীনতার অংশ।

রায়হানের মায়ের স্বপ্নভঙ্গ: দায়ী আকবর

‘এসআই আকবরসহ তার সহযোগীরা আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে’-এমন এমন মন্তব্য করে আক্ষেপের সুরে মাথা চাপড়ে নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করেছি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। যখন সুখের স্বপ্ন দেখছিলাম, তখনই সব শেষ করে দিলো।

তিনি বলেন, কদিন পরই হয়তো রায়হান আমেরিকাবাসী হতো। কিন্তু সব তছনছ করে দিছে আকবর।

সালমা বেগম জানান, ২০১৭ সালে দিকে ছেলেকে বিয়ে দেন। ছোটখাটো চাকরি করলেও সংসার ছিল অনাবিল আনন্দ। স্ত্রী-সন্তান ও মায়ের প্রতি রায়হানের ভালোবাসার কমতি ছিল না।

তিনি বলেন, রায়হানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাকে আমেরিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করি তার এক চাচার মাধ্যমে। তিনি আমেরিকায় থাকেন। গত জুলাই মাসের দিকে আমেরিকা থেকে সব কাগজপত্র আসে। দূতাবাসের ফি জোগাড় করতে দেরি হওয়াই রায়হানের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, রায়হানের এক মেয়ে জন্ম হওয়ায় একটু সময় নেই আমরা। নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে রায়হানের আমেরিকা অ্যাম্বাসিতে ভিসা নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু, আমার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেলো। কারণ ছাড়াই নির্দোষ ছেলেটিকে পিঠিয়ে মেরে ফেললো পুলিশ হেফাজতে। পুলিশের কাছে নিরপরাধ বলে কান্নাকাটি করে পায়ে ধরলেও তাকে বাঁচতে দেয়নি তারা।

তিনি বলেন, আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। এরা পুলিশ নামের কলঙ্ক। আমি ছেলে হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

সূত্র জানায়, রায়হানের পিতা মৃত রফিকুল ইসলাম ছিলেন বিজিবির সৈনিক পদে কর্মরত। রায়হান যখন তার মায়ের গর্ভে (৭ মাসের) ছিলেন তখন তার পিতা চাকরিরত অবস্থায় বিজিবি ক্যাম্পেই মারা যান। এরপর থেকে শুরু হয় রায়হানদের পরিবারে টানাপোড়েন। পরিবারটির প্রতি সহায়তার হাত বাড়ান স্বজনরা।

নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বলেন, জীবনটাই শেষ হয়ে গেলো। অনটন থাকলেও সংসার ছিল বেশ সুখের। সুখটা নষ্ট করে দিলো পুলিশ। মেয়েটাকে জীবনের জন্য পিতৃহারা করে দিলো। তিনি বলেন, আমি স্বামী হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্মম হত্যা ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। মামলা দায়েরের পর এর তদন্তভার নেয় পিবিআই।

ঘটনার পর থেকে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়া দুই এএসআই ও চার কনস্টেবল পুলিশের পাহারায় সিলেট পুলিশ লাইনে আছেন বলে জানান মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের।

তিনি বলেন, হত্যা মামলাটির পুরো বিষয় তদন্ত করছে পিবিআই। তিনি বলেন, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্ত হওয়া ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া পলাতক। পুলিশ তাকে খুঁজছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে এসআই আকবর যেন দেশ ছাড়তে না পারে, সেজন্য পুলিশের নজরদারি রয়েছে।

পিবিআই কাষ্টঘরের দুজন জিঞ্জাসাবাদ করছে

এদিকে, পিবিআই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে ইতিমধ্যে কাষ্টঘর এলাকার সুইপার কলোনির সুলাই লালসহ দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মো. খালেদুজ্জামান জানান, তদন্তকালে যাদের না পাওয়া যাবে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। মামলাটি স্পর্শকাতর, তাই সব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত সোমবার বেলা ৩টা ১০ মিনিট পর্যন্ত আকবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতেই অবস্থান করছিলেন। আকবর তার নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সরকারি সেট দুটোই ফাঁড়িতে রেখে গায়েব হয়েছেন। এর আগে তিনি সিসিটিভিতে খুনের সব আলামত নষ্ট করেন। তবে ফাঁড়ির ইনচার্জ গা ঢাকা দিলেও অভিযুক্ত অন্য সদস্যদের পুলিশ লাইন্সে রাখা হয়েছে। এএসআই আশেক এলাহি, কুতুব উদ্দিন, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ, হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও সজিব এখন পুলিশ লাইন্সে বিশেষ নজরদারিতে আছেন।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত