পলান সরকারের দেখানো পথে বইপ্রেমী হারুন-অর-রশীদ

পলান সরকারের দেখানো পথে বইপ্রেমী হারুন-অর-রশীদ
পলান সরকার ও হারুন-অর-রশীদ। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী অঞ্চলের পলান সরকারের কথা কম-বেশি সকলেই জানেন। বইপ্রেমী পলান সরকার পায়ে হেঁটে একটানা ৩০ বছর ধরে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের কাছে বই পৌঁছে দিয়েছেন। চেয়েছেন সকলের মাঝে জ্ঞানের আলো বিতরণ করতে। গত বছরের ১ মার্চ পলান সরকার মারা যান। কিন্তু তার দৃষ্টান্ত যিনি অন্তরে লালন করে চলেছেন তিনি হলেন হারুন-অর-রশীদ। পেশায় তিনি একজন ব্যাংকার হলেও আপাদমস্তক তিনি একজন বইপ্রেমী মানুষ।

ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জে। বইপ্রেমী এই মানুষটির জন্ম কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া গ্রামে হলেও, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে বর্তমানে তিনি নবাবগঞ্জে কর্মরত আছেন গ্রামীণ ব্যাংকে। ওখানেই গড়ে তুলেছেন তার বইয়ের স্বর্গরাজ্য। ছোট্ট বাসাটি যেন শুধু বইয়ের আবরণেই মোড়ানো। তাকে তাকে সাজানো অসংখ্য বই। এই যে এত বই, এগুলো কী নিতান্তই শখের বসে শুধু সংগ্রহের জন্য? দিলেন এক চমকপ্রদ তথ্য। দৈনন্দিন বাজার খরচ বাঁচিয়ে কোনো রকম দিনাতিপাত করে দিনের পর দিন অতি কষ্টে তিনি সংগ্রহ করেছেন এই বই। শুধু নিজের জন্য নয়। আশে-পাশের মানুষের মাঝে সভ্যতার আলো বিলিয়ে দেয়ার জন্য।

কথার ছলে আরো অনেক গল্প শুনলাম বইপ্রেমী এই মানুষটির কাছ থেকে। বই নিয়ে এই মানুষটির পাগলামির যেন অন্ত নেই। ছোটবেলায় বইয়ের পাতার ঘ্রাণে যেমন শৈশব খুঁজে পেতেন, এখন এবেলায় এসেও তিনি বইয়ের পাতায় যেন তার সেই হারানো শৈশবকেই খুঁজে পান। অফলাইন কিংবা ডিজিটাল মাধ্যম বই নিয়ে তার কাজের কোনো অন্ত নেই। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকশ’ দেশি-বিদেশি বইয়ের রিভিউ লিখে অনলাইনে তিনি ঝড় তুলেছেন। বইয়ের প্রচার নিয়ে কিংবা বইয়ের কথা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উদ্যমী এ মানুষটির চিন্তার যেন শেষ নেই।

ডিজিটাল মাধ্যমেই শুধু থেমে নেই তার কাজের গতি, অফলাইনেও এই বইপ্রেমী মানুষটির কাজ যেন আরও চমৎকার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে, শহরে বাসায় গিয়ে মানুষের কাছে বই পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছেন একেবারে নিজ উদ্যোগে। সপ্তাহ শেষে আবার নতুন বই দিয়ে নিয়ে আসছেন পুরনো বই। মহামারী করোনার সময়েও থেমে নেই তার এ মহৎ কাজটি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে বই পৌঁছে দিয়েছেন ঘরবন্দি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। এ যেন আরেক পলান সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক আর অন্যান্য অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌরাত্ম্যে শিশু কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা যখন বুঁদ হয়ে থাকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার নেশায়, একজন বইপ্রেমী হারুন তখন বই কাঁধে ছুটে বেড়ান গ্রামের পর গ্রাম।

ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকে এই মানুষগুলোকে বইয়ের দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনতে শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সবার হাতে তুলে দিচ্ছেন বই। আপাত দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে সত্যিই এটি অভিনব উপায়ে বইয়ের কথা ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত একজন বইপ্রেমীর সত্যিকারের গল্প।

বিশেষ করে তরুণ সমাজকে বইমুখী করতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন অবিরত। মাদকাসক্ত তরুণদের হাতে তিনি মাদকের বদলে তুলে দিচ্ছেন বই। মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়া এই তরুণদের অবিশ্বাস্যভাবে ফিরিয়ে আনছেন বইয়ের দুনিয়ায়। গত দশ বছরে তিনি প্রায় দুই শতাধিক তরুণকে মাদকের জগত থেকে বইয়ের জগতে ফিরিয়ে এনেছেন। রাত গভীর হলেই যে ছেলেটি হাতে মাদক তুলে নিত, মাদকের উন্মাদনায় যে ছেলেটি কাটিয়ে দিত বিনিদ্র রজনী, তার হাতে আজ শোভা পাচ্ছে বই। মাদকাসক্ত সেই ছেলেটির রাত কাটে এখন বইয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে। মাদকসহ অনলাইনের আসক্তি কমিয়ে তরুণদের একটা বিশাল অংশকে তিনি এভাবেই ফিরিয়ে আনছেন বইয়ের রাজ্যে।

নিরন্তর ছুটে চলা এই বইপ্রেমী মানুষটি সভ্যতার মশাল হাতে নিয়ে তাই কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন, ক্লান্তহীনভাবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন একটা সভ্য সমাজের। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি লাইব্রেরি তৈরিতেও রাখছেন এক অসামান্য অবদান। সমাজের বিত্তশালীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদের প্রদত্ত অর্থ দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তুলছেন উন্মুক্ত পাঠাগার। বিভিন্ন সেলুন কিংবা চা-কফির দোকানেও তিনি বই দিয়ে করে যাচ্ছেন বইয়ের প্রচারণা। এই বইপ্রেমীর আরও একটি পরিচয় আছে। একজন দুর্দান্ত পাঠক তো বটেনই, তিনি একজন লেখকও। কথায় আছে, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে।

২০২০ বইমেলায় প্রকাশিত একটি থ্রিলার পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। মহামারী করোনাকালে প্রকাশিত ‘ইস্কাপনের টেক্কা’ ইতোমধ্যেই বেস্ট সেলারের খ্যাতি অর্জন করেছে। বই নিয়ে তার স্বপ্ন অনেক। তার এ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি চাই পৃথিবী বইয়ের হোক। প্রতিটি মানুষের ঘর হোক বইয়ের স্বর্গরাজ্য। স্মার্টফোন নয়, তরুণদের হাতে শোভা পাক বই।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত