নীড়ের খোঁজে দুই ভাইয়ের অর্ধশতাব্দী পথ চলা....

নীড়ের খোঁজে দুই ভাইয়ের অর্ধশতাব্দী পথ চলা....
মৃণাল কান্তি বসু ও দিপক কান্তি বসু। ছবি: ইত্তেফাক

সাধারণত গল্প-উপন্যাসে আমরা বিভিন্ন হৃদয়বিদারক গল্প কাহিনীর কথা জেনে থাকি,কিন্তু বাস্তবে সেগুলোকেও যেন হার মেনেছে দু’ভাই রাম ও লক্ষণের কাছে। রাম ও লক্ষণ দু’ভাই যেন একে অপরের হৃৎপিণ্ড। তবে এ রাম-লক্ষণ হলো মৃণাল কান্তি বসু ও দিপক কান্তি বসু। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের মমত্ববোধ হার মানিয়েছে সকল ইতিহাস। দু’ভাই আলাদা হয়ে পড়তে পারেন এমন আশংকায় জীবনে সংসারও পাতেননি কেউ। তাদের এমন অনড় সিদ্ধান্ত কেড়ে নিয়েছে যৌবনের বধূনারী। নিজেদের সপে দেননি বধূনারীদের কাছে। বিয়ে নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। এ যেন ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের ভালবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ছোটবেলা থেকেই দু’ভাই সব সময় এক সাথে খাওয়া থেকে শুরু করে সব কাজ এমনকি সর্বত্র বিচরণও একসাথে। সাদা মনের দুই ভাইয়ের এক জনের নাম মৃণাল কান্তি বসু (৮১) ও অপরজন ছোট ভাই দিপক কান্তি বসু (৭৬)। তবে ছোট বেলা থেকেই এলাকাবাসী তাদেরকে রাম-লক্ষণ,মানিক-জোড়সহ বিভিন্ন নামে ডেকে থাকেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দু’ভাই ঘুরে বেড়ান একেক এলাকায়। কখনো মৃণাল আগে আবার কখনো দিপক। এভাবেই সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি হেঁটে চলা তাদের।

বিশ্রামাগার বলতে বিভিন্ন মন্দির বা আশ্রমে। তাদের আদি নিবাস পাইকগাছার কপোতাক্ষের কোলঘেঁষা হরিঢালী গ্রামে হলেও তালা উপজেলার কানাইদিয়া গ্রামে প্রায় ৩০ বছর ধরে তাদের বসবাস। নিজেদের প্রয়োজনের বাইরে কারো সাথে কথা বলেন না ঐ দু’সহোদর। তবে নিজের পৈত্রিক জমি উদ্ধারের জন্য তারা মামলা চালাতে নিয়মিত পায়ে হেঁটে খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে থাকেন বলে জানান তারা।

তালার কানাইদিয়া গ্রামের উদয় মন্ডল (বর্তমানে পাইকগাছা উপজেলা সেনেটারী কর্মকর্তা) বলেন, ছোট বেলা থেকে তাদের মধ্যে বড় ভাই মৃণাল কান্তি বসুকে তারা সাহেব দা’ নামেই জানতেন। এমনকি জন্মের পর থেকে তারা তাকে তাদের ফ্যামিলি মেম্বর বলে জেনেছিলেন সাহেব দা’কে। তবে বড় হওয়ার পর জেনেছিলেন, সাহেব দা’রা অর্থাৎ মৃণাল কান্তি বসু ও দিপক বসু ঐ বাড়িরই কেউ নন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তাদের পূর্বপূরুষরা জমিদার ছিলেন। আদি নিবাস পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী গ্রামের হলেও প্রায় ৩০ বছর তালার কানাইদিয়া গ্রামে তাদের বসবাস। তবে নিয়তির নির্মম পরিহাস আর কালের বিবর্তনে সবই আজ এক স্বপ্নময় সোনালী অতীত। পোশাক-পরিচ্ছেদ,আচার-আচরণ ও চাল-চলনে রয়েছে সেই জমিদারী আভিজাত্য। ছোট বেলা থেকেই দু’ভাই সংসার বিবাগী নেই কোন ঘর-সংসার। নিজের বলতে হাতের দু’টি ব্যাগ ও পরিধেয় বস্ত্র। তারা সর্বহারা হলেও কারোর কাছ থেকে সাহায্য কিংবা সহযোগিতা নেন না। শোনা যায়, গোপনে একটি বুনিয়াদী পরিবারের যৎসামান্য সহযোগিতায় চলে তাদের যাপিত জীবন। চলতে পথে পরিচিত বুনিয়াদীদের সাথে ছাড়া তারা বিশেষ কারো সাথে কথাও বলেন না তারা। তবে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পরিপাটি বলে মনে হলেও সারাক্ষণ তাদের মধ্যে একটা অসহায়ত্ব কাজ করে সেই প্রথম থেকে। কখনো কখনো সান্ত্বনা পেতে ছুটে যান পৈত্রিক নিবাস হরিঢালীতে।

তবে এলাকাবাসী জানায়, এলাকায় ফিরলেও তাদের পুরাতন বাড়িতে প্রবেশ করেননা। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার ফিরে আসেন পথে। আসলে পথই যেন তাদের আসল ঠিকানা। বরাবর নির্লোভী দু’ভাই সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়েন ছুটে চলেন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। উদ্দেশ্য আগামী দিনের জীবিকা। তবে সকলের সাহায্য গ্রহণ করেন না তারা। ছোটবেলা হতে আজ পর্যন্ত পথ চলার ধরণটা পরিবর্তন হয়নি তাদের। আর তাই বলা চলে চিরচেনা সেই রাজহংসীর রাজকীয় দুলকিতে সামনে-পিছে করে দু’ভাইয়ের পথ চলা যেন শেষ হয়না।

তাদের ব্যাপারে স্থানীয় শিক্ষক সমীরণ বলেন, এক সময় সাহেব (মৃণাল) ভারতে রেলওয়েতে চাকুরি করতেন। প্রায় ৫ বছর পর চাকুরি ছেড়ে গ্রামে এসে আর ফিরে যায়নি। তাছাড়া শুনেছেন হরিঢালী পুলিশ ক্যাম্পের পাশে তাদের জায়গা-জমি ছিল। পরবর্তীতে সেটা স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে এখনো মৃণাল-দিপকরা খুলনা জজ কোর্টে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানেন তিনি।

হরিঢালী ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর সিদ্দিকী রাজু তাদের দু’ভাইয়ের ব্যাপারে বলেন, আমার আব্বা মরহুম এস,এম,রফিক উদ্দীন যখন চেয়ারম্যান ছিল তখন থেকে শুনছি দু’ভাইয়ের পৈত্রিক জমি-জমা নিয়ে ঝামেলা চলছে। এনিয়ে ঐ সময় অনেক দেন দরবারও হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি। তবে দীর্ঘদিনের সময় ক্ষেপনে জমির কাগজপত্র তৈরি হয়ে ইতোমধ্যে তা বেঁচা-কেনাও হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রশিদুজ্জামান মোড়ল বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন জমি নিয়ে সালিশ করেছিলেন,পরবর্তীতে দু’ভাইয়ের পক্ষে কেউ আর কোন প্রকার যোগাযোগ করেনি।

এদিকে জীবনের একেবারেই পড়ন্ত বেলায় দু’বৃদ্ধ ভাইকে পথে পথে ঘুরতে দেখে কৌতুহলী অনেকেই তাদের মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। অনেকেই বলেন,পয়সার অভাবে মামলার কাজে জেলা শহরে যেতে দু’ভাই এখনো পায়ে হেঁটে পৌঁছান গন্তব্যে। এখন আর আগের মতন চোখেও ভাল দেখেন না। কানেও কম শোনেন। শেষ সময়ে সাহেব-মানান্তরদের অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই প্রয়োজন বলেও মনে করেন এলাকাবাসী।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত