রায়হান হত্যার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন গুজব

রায়হান হত্যার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন গুজব
রায়হান উদ্দিন। ছবি : সংগৃহীত

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়া রায়হান উদ্দিনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কয়েকদিন ধরেই আলোচনায় থাকা এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু পিবিআইকে হস্তান্তর করা ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রথম প্রতিবেদনে রায়হানের শরীরে ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন সাধারণ অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে ছড়িয়ে দেয়া প্রোপাগান্ডার থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ড. আসিফ নজরুলের দেয়া ফেসবুক পোস্ট। যেখানে লেখা হয়েছে, 'সিলেটে রায়হান মারা গেছে ফাঁড়িতে, পুলিশের পিটুনিতে। অথচ প্রথমবার ময়নাতদন্তে ডাক্তার আঘাতের কোনো চিহ্ন পায়নি। ২য় ময়নাতদন্তে ডাক্তার পেয়েছে শতাধিক আঘাতের চিহ্ন।'

এদিকে, পিবিআই-এর হাতে আসা প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুসারে, রায়হানের শরীরে ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। লাঠির আঘাতের কারণে চামড়া ছিলে যাওয়ার ১৪টি জখম পাওয়া গেছে। তার দুটি আঙুলের নখ উপড়ে ফেলাসহ পুরো শরীরে শুধু লাঠির আঘাত রয়েছে ১১১টি। নির্যাতনের সময় রায়হানের পাকস্থলীও খালি ছিল।

ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুল ইসলাম বলেন, প্রথম দফার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ১৫ অক্টোবর পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রিপোর্টে রায়হানের শরীরে ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এরমধ্যে শরীরের রয়েছে ১১১টি ও হাতের দুটি নখ উপড়ানোসহ মোট ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। লাঠি দিয়ে আঘাত করায় রায়হানের শরীরের রগগুলো মারাত্মকভাবে জখম হওয়ায় ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়।

এ সময় দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ রায়হানের লাশের সুরতহাল যেভাবে তৈরি করেছে আঘাতগুলো উল্লেখ করে সেভাবে আমরাও পেয়েছি ময়নাতদন্তের সময়। তবে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পুনরায় ময়নাতদন্তের আবেদন করায় লাশ তুলে আবার ময়নাতদন্ত করা হয়। শেষের ময়নাতদন্তে তেমন কিছু মিলবে না। কারণ লাশটি পচে গেছে। তবুও আমরা বিষয়টি দেখছি।’

দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে লাশ পচে যাওয়ায় তেমন কিছু না পাওয়ার কথা ফরেনসিক বিভাগ জানালেও ড. আসিফ নজরুলের মতে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে 'শতাধিক আঘাতের চিহ্ন'। ভেরিফাইড প্রোফাইল থেকে এ ধরনের ভুল তথ্য প্রকাশের কারণে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আসিফ নজরুলের এই পোস্টের পর মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তা সরিয়ে নেন তিনি এবং নতুন করে পোস্টে এই তথ্যগুলো মুছে ফেলেন।

এ বিষয়ে তার এক অনুসারী পরবর্তী পোস্টের কমেন্টে লেখেন, ‌‘স্যার আগের স্ট্যাটাস টা সত্যি না মিথ্যা ছিলো??একটু যদি নিজের টাইম লাইনে ব্যাপারটা নিশ্চিত করতেন।।।ভুল হতেই পারে।।।কিন্তু একটা প্রফেশনের উপর আপনি দায় দিয়েছেন।।যদি সবাইকে আপনি ভুল জানিয়ে থাকেন তাহলে সেটা যে ভুল জানিয়েছিলেন সেটা সবাইকে জানিয়ে দেয়াও আপনার দায়িত্ব বলেই মনে করি..ধন্যবাদ..’

তার আরেক অনুসারী কমেন্টে লেখেন, 'চিকিৎসক সমাজ করোনাকালীন সময়ে নিজেদের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েও যেভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন সেটা অতুলনীয়। সংখ্যা হিসেবে করোনা চিকিৎসা করতে গিয়ে যতজন চিকিৎসক প্রাণ দিয়েছেন তা পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো থেকে বেশি । জীবন বাজি রেখে এধরনের আত্মত্যাগ নজির বিহীন। মৃত চিকিৎসকদেরও পরিবার পরিজন আছে। তারপরও কিছু লোক সবসময়ই চায় বাংলাদেশের জনগণ দেশের চিকিৎসকদের উপর আস্থা হারাক এবং ভারতে চিকিৎসা নিয়ে সে দেশের অর্থনীতির গতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখুক। আপনাকে আর যাই হোক কখনো ভারতের দালাল মনে হয় নি। নিজের লিখায় আরো দায়িত্বশীল হবেন এই কামনা করছি।'

এমন বিভিন্ন মন্তব্য আসার পর দ্বিতীয় ফেসবুক পোস্টও মুছে ফেলেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলো তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, করোনা পরবর্তী সময়ে দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা ও গুজব ছড়িয়ে দেয়ার হার বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয়ে হয়েছে। এই মর্মে শাস্তিও প্রদান করা হয়েছে অনেকে। কিন্তু তারপরও গুজবের লাগাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরো সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত