লালমনিরহাটে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তিন মামলা, আটক ৫

লালমনিরহাটে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তিন মামলা, আটক ৫
লালমনিরহাটে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তিন মামলা, আটক ৫।ছবি: ইত্তেফাক

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী কেন্দ্রীয় মসজিদে কুরআন অবমাননার গুজবে মানসিকভাবে অসুস্থ রংপুরের আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েলকে (৫০) পিটিয়ে হত্যার পর লাশ আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় পাটগ্রাম থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ও রংপুর পুলিশের ডিআইজি সকালে উপজেলার শহীদ আফজাল হলরুমে পাঁচ শতাধিক আলেম-ওলামা ও মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সাথে গুজব রোধে গুরুত্বপূর্ণসভা করেন। এর আগে সকাল এগারটায় পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে ঘটনাস্থলসহ ওই কেন্দ্রীয় মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুঁইয়া ও রংপুর পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রংপুর পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, পিটিয়ে হত্যা ও লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় অন্য কারও ইন্ধন থাকতে পারে। রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভুঁইয়া ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক তাদেরকে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

আরও পড়ুন: করোনায় কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের মৃত্যু

গত বৃহস্পতিবারের ওই কথিত গুজবে সাড়ে ৪ ঘণ্টাব্যাপী চলা বিক্ষুব্ধ জনতার তাণ্ডবলীলা থামাতে পুলিশ ১৭ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়ে। ওই দিন রাতেই পুলিশ নিহতের পুড়িয়ে দেওয়া দেহ ভস্ম উদ্ধার করে। আহত একই এলাকার অপর ব্যক্তি সুলতান জুবায়ের আব্বাসকে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় পরদিন শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টিএমএ মমিনকে প্রধান করে একটি ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত টিমসহ (সিআইডি) বিভিন্ন সংস্থাও মাঠে তদন্তে নেমেছে। আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রিপাড়ার আবু ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। জুয়েল রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের গ্রন্থাগার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এক বছর আগে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। আর আহত সুলতান জোবায়ের আব্বাস (৫১) রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার শেখ আব্বাস আলীর ছেলে।

সরেজমিন জানা গেছে, বৃহস্পতিবার আসরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে আসা সহিদুন্নবী জুয়েল র‌্যাব পরিচয় দিয়ে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীকে মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি চালাতে থাকে। এসময় কাঠের তাকে রাখা কোরআন শরীফের পাশে পা দিয়ে খোঁজার ঘটনায় গুজবের সৃষ্টি হয়। ওই সময় মসজিদের ভেতরে এবং বাইরে থাকা মুসল্লিগণ জুয়েলের ওপর চড়াও হয়। এ খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লে বুড়িমারী বাজারের লোকজন মসজিদের দিকে ছুটতে থাকেন। ঘটনা বেগতিক দেখে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুল ইসলাম ওই দুই ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদের একটি রুমে নিয়ে যান। এ সময় ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুন নাহার, পাটগ্রাম থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুমন কুমার মহন্ত ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত উপস্থিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও শান্ত করতে পারেন নি। এ সময় উত্তেজিত লোকজন ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের দেয়াল, গ্রীল ও দরজা ভেঙ্গে সহিদুন্নবী জুয়েলকে পেটাতে পেটাতে বাইরে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। এরপর তার লাশ রশিতে বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু দূরে বাঁশকল এলাকায় পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। এই অবস্থায় পাটগ্রাম থানার ওসি আহত সুলতান জোবায়ের আব্বাসকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। উত্তেজিত লোকজনের হাত থেকে নিরাপদে সরে যান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত