ডিগ্রিবিহীন হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চলছিল পায়ুপথের চিকিৎসালয়

ডিগ্রিবিহীন হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চলছিল পায়ুপথের চিকিৎসালয়
ডিগ্রি বিহীন হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চলছিল পায়ুপথের চিকিৎসালয়।ছবি: গুগুল ম্যাপ থেকে

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কুজাইল বাজার সংলগ্ন হিন্দু পাড়া গ্রামের মধ্যে অটোচার্জার গ্যারেজের মধ্যে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবৈধ চিকিৎসালয় গড়ে তোলে অমলা সরকার নামের কথিত হাতুড়ে এক নারী ডাক্তার। তিনি ও তার সহকারী এক গৃহবধূকে নিয়ে পায়ুপথের (মলদ্বার) জটিল অপারেশনসহ যাবতীয় চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠে।

স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের মাধ্যমকে ম্যানেজ করে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে এ ধরনের জটিল চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন মৃত খোকনের স্ত্রী অমলা সরকার। যেকোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সচেতন মহল আশংকা প্রকাশ করে।

এরপর গত শুক্রবার (২০ নভেম্বর) স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ছদ্মবেশে চিকিৎসালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে এসে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করলে মঙ্গলবার সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক রাশেদুল ইসলাম এই অভিযান পরিচালনা করেন।

স্থানীয় সূত্র ও প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলা সদর থেকে ২নং কাশিমপুর ইউনিয়নের কুজাইল বাজার সংলগ্ন হিন্দু পাড়ায় লিয়াকত আলী মোল্লার বাড়ির দু’তিনটি ভাঙাচুরা, জরাজীর্ণ নোংরা পরিবেশের ২টি ঘর ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয় পায়ুপথের (মলদ্বারের) চিকিৎসালয়। সেখানে কথিত হাতুড়ে অমলা সরকার নামের ডাক্তার পাইলস, ফিস্ট্রুলা, অর্শ্ব, পুজপড়া, রক্ত পড়া নামের জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এখানে রোগীরা এলে প্রাথমিক ভাবে ২০০ টাকা ফি নিয়ে রোগীদের রোগ নির্ণয় করা হয়। এরপর ব্রেন মোটিভেশন দিয়ে ব্রেন ওয়াশ করে নিজেদের কজ্বায় আনা হয়। তারপর ১০ থেকে ২০হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। প্রথমে বিভিন্ন ঔষধ দিয়ে নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি ইনজেকশন প্রয়োগ, ঔযুধ প্রয়োগের পর অবস্থা বুঝে অপারেশন করেন ডাক্তার। একটি কথিত অপারেশন থিয়েটার ঘর কাম নারী রোগীদের থাকার ঘর অন্যটি পুরুষ রোগীদের জন্য। নারীদের থাকার ঘরটিতেই অপারেশনের কার্যক্রম চলে। ভর্তি রোগীদের অপারেশনের পর ৭-৯ দিন সেখানেই থাকতে হয়। কথিত ডাক্তার অপারেশন করার পর থেকে ওই বাড়ির মালিকের বড় ছেলের স্ত্রী আসমা বেগম হাতুড়ে ডাক্তারের সহকারী হিসেবে সেবা করা, ওষুধ প্রয়োগসহ সেবিকার কাজ করে থাকেন। সেখানে এলাকার মানুষের চেয়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মানুষরা চিকিৎসা নেওয়ার জন্য এসে অবস্থান করে। মাটির চুলায় নিজেদের রান্না করে খেতে হয়। অপারেশনের রোগী প্রতি ১ হাজার ৫’শ টাকা ভাড়া বাড়ির মালিক লিয়াকত আলী মোল্লাকে ভাড়া হিসেবে দিতে হয়। আর বাকী টাকা থাকে ডাক্তার ও তার সহকারীর পারিশ্রমিক হিসেবে।

এ ধরণের জটিল চিকিৎসা ও অপারেশনের সরকারি কোন অনুমোদন না থাকার কথা স্বীকার করে কথিত হাতুড়ে ডাক্তার অমলা সরকার নিজেকে নার্স হিসেবে দাবি করে জানান, তিনি বগুড়ার মিশন হাসপাতালে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়েই রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন। তার কাছে আর্মি, পুলিশসহ সরকারি অফিসারেরা চিকিৎসা নিয়ে বেশ ভালো আছেন বলে জানান। তবে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেই সব ব্যক্তিদের নাম ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর চাইলে তাদের নিকট সংরক্ষণ নেই বলে দাবি করেন।

আরো পড়ুন: স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে কুবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

তিনি আরো জানান, তার শ্বশুরের দেওয়া গোপন ফর্মুলা ব্যবহার করে তিনি নিজেই ইনজেকশন তৈরি করে এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক রাশেদুল ইসলাম বলেন, কুজাইল গ্রামের মৃত শিমন ডাক্তারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে চিকিৎসার কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়। এই জন্য শিমন ডাক্তারের স্ত্রী জয়া সরকারকে ৫হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই স্থানে মৃত খোকন ডাক্তারের স্ত্রী অমলা সরকারের ভাড়া করা চিকিৎসালয়ে অভিযান চালিয়ে চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত কিছু উপকরণ উদ্ধার করা হয়। আমাদের অভিযান টের পেয়ে অমলা সরকার ফোন বন্ধ করে পালিয়ে যান। তাই বাড়ির মালিক লিয়াকত আলী মোল্লাকে ৫হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে এই দুই চিকিৎসালয়ে যেন আর কোন দিন কোন প্রকারের চিকিৎসা সেবা দেওয়া না হয় সেই মর্মে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খাঁন (অংকুর) বলেন, সরকারের অনুমোদন ছাড়া কেউ কোন বিষয়ে কোন রোগের চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার রাখে না। তাই এই সব অখ্যাত-কুখ্যাত চিকিৎসালয়ের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, আমরা প্রাথমিক তথ্যাদি পেয়ে এই দুটি অবৈধ চিকিৎসালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেছি। উপজেলায় যদি আরো এই ধরনের চিকিৎসালয় থাকে তাহলে আমাকে তথ্যাদি দিলে সেগুলোতেও এই ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। আগামীতে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এএএম

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত