আদালতের ব্যতিক্রমী রায়: ৪৮ স্বামী-স্ত্রী মিলে থাকার অঙ্গীকার

আদালতের ব্যতিক্রমী রায়: ৪৮ স্বামী-স্ত্রী মিলে থাকার অঙ্গীকার
আদালতের ব্যতিক্রমী রায়: ৪৮ স্বামী-স্ত্রী মিলে থাকার অঙ্গীকার

এটা কোন ছায়াছবি নয়। কোন গল্প বা উপন্যাসও নয়। কঠিন এক বাস্তব চিত্র। আদালতের একটি রায়ে পাল্টে গেলো দৃশ্যপট। আনন্দে ও স্বস্তিতে চোখের কোণ ভিজে উঠার মতো দৃশ্য। যেখানে ৪৮ নারী ও তাদের শিশুদের কান্নায় আদালত প্রাঙ্গণ বিষাদময় হয়ে উঠার কথা। মানুষের বুকের ভেতর হু-হু করে উঠার কথা। সেখানে শান্তির সুবাতাস বয়ে গেলো। যে রায়ে ৪৮টি সংসার তছনছ হয়ে যাওয়ার কথা। যেখানে স্বামী-স্ত্রী আবার হাসলেন।

স্ত্রীর ঠাঁই হলো স্বামীর ঘরে। স্বামীও ফিরে পেলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। শিশু সন্তানটি আবার ফিরে পেলো বাবা নামের নিশ্চিন্ত ভরসার স্থান। ছোট্ট ছোট্ট শিশুগুলো বাবাকে জড়িয়ে ধরে নিরাপদে মাথা গুঁজে নিলো তার কাঁধে।

বুধবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলায় ৪৮ জন স্বামীকে তাদের স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় বুধবার সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন আসামিদের কারাগারে না পাঠিয়ে বাদী-বিবাদী (স্বামী-স্ত্রীকে) একত্রে বসবাস করার শর্তে আপোষ নিষ্পত্তি করে দিয়ে এক ব্যতিক্রমী রায় দেন।

সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের এই রায়টি প্রশংসায় ভাসছে সুনামগঞ্জ তথা সিলেট অঞ্চলে। রায় ঘোষণার পর স্বামী-স্ত্রীদের ফুল দিয়ে বরণ করেন। এ সময় ৪৮ টি পৃথক মামলার বাদী-বিবাদীর আপোষ নিষ্পত্তির অঙ্গীকারনামা পেয়ে আদালত একসঙ্গে দেওয়া রায়ে ৪৮ জন বাদী-বিবাদী (স্বামী ও স্ত্রীকে) একত্রে মিলেমিশে সংসার করার আদেশ দেন।

আপোষনামায় ৪৮ দম্পতি অঙ্গীকার করে বলেন, সন্তানাদি নিয়ে ও পরিবারের অন্যদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সংসার ধর্ম পালন করবেন। সংসারে শান্তি বিনষ্ট হয় এমন কোন কাজ তারা করবেন না। স্বামী-স্ত্রী উভয়, উভয়কে যথাযোগ্য মর্যাদা দিবেন। তারা আরো অঙ্গীকার করেন যে,স্বামী-স্ত্রী বা তার মা-বাবা ও অভিভাবকের কাছে যৌতুক দাবি করবেন না। পারিবারিক বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য ও বিরোধ দেখা দিলে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করবেন। স্বামী কখনও স্ত্রীকে নির্যাতন করবেন না। স্ত্রীকে নির্যাতন করলে বা যৌতুক দাবি করলে স্ত্রী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

আরো পড়ুন: নেয়াখালীতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে গণসমাবেশ

সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নান্টু রায় বলেন, আদালত পৃথক ৪৮টি নারী-শিশু নির্যাতন দমন মামলায় একসঙ্গে যুগান্তকারী রায় দেন। সকল মামলার বাদী বিবাদীকে আপোষে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তারা ঝগড়া-বিবাদ না করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করবেন। আদালতের হস্তক্ষেপে স্বামীরা নিজ নিজ পরিবারে কাছে ফিরে আসবেন এমন খবরে স্ত্রীরা ফুল নিয়ে এজলাসের সম্মুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার দৃশ্যটি ছিল সত্যি মনোহর। এসময় অনেক স্বামী-স্ত্রীর চোখের কোন ভিজে উঠতে দেখা যায়।

আদালত সূত্র জানায়, নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪৮ নারী তাদের স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছিলেন। মামলার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংঘাতময় অবস্থান তৈরি হয়। এর ফলে তাদের সন্তানদের জীবন, নিরাপত্তা, খাদ্য, বাসস্থান, আদর-যত্ন, ভালোবাসা, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে যায়। স্ত্রী স্বামীর ঘরছাড়া হয়ে সন্তান-সন্ততি নিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের পথে ছিলেন। সেই অনিশ্চিত জীবনের পথ থেকে আদালত তাদের সংসার ও সমাজ জীবনে শান্তি ও সৌহার্দ্যর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেন। আসামিদের অনেকেই খালাস পেয়ে আনন্দে কেঁদে উঠেন। প্রিয় সন্তানদের কোলে তুলে নেন। শাস্তি নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির সুবাতাস বিলিয়ে মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে ৪৮টি পরিবারকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সংসার ভাঙন থেকে ৪৮ টি সংসার জোড়া লাগার এমন ঘটনা বাদী-বিবাদী, আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষকেও উৎফুল্লিত করেছে।

ইত্তেফাক/এএএম

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত