নিয়োগের ক্ষেত্রে বানরের পিঠা ভাগের মতো চলছে ২৩ বছর

পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে সংস্কার চাইলেন সংশ্লিষ্টরা
নিয়োগের ক্ষেত্রে বানরের পিঠা ভাগের মতো চলছে ২৩ বছর
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্র। ছবি: সংগৃহীত

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ে সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান পার্বত্য জেলা পরিষদ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদে কোনো নির্বাচন হচ্ছে না। অযোগ্যদের দিয়ে পরিষদ চলছে। শুধু রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীনে ৭৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৩৬টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বানরের পিঠা ভাগের মতো চলছে ২৩ বছর অনিয়ম।

ঘুষ-বাণিজ্য, দলীয় ও আত্মীয়করণসহ স্বজনপ্রীতির ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। বাঙালিরা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এ কারণে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করছে। এই অবস্থার অবসান ঘটাতে পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে সংস্কার চেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদ তাদের অধীনে। ১৫ সদস্যের রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীনে নিয়োগসহ ২২টি বিষয় ন্যস্ত। আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত ভোটারদের দিয়ে প্রত্যক্ষ ভোটে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মনোনয়ন দিয়ে পুনর্গঠন হয়ে আসছে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। এতে অযোগ্য ও অশিক্ষিত মানুষ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকছেন। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ৬ষ্ঠ শ্রেণী পাশ। ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে গত কোনো নির্বাচন দেয়া হয়নি। তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদে প্রথম ও শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগণের তীব্র দাবি উপেক্ষা করে পরিষদ তিনটি পরিচালনা করে আসছে নিজেদের লোক মনোনয়ন দিয়ে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির শর্তে প্রবর্তিত আইনে বলা আছে, পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে প্রণীত পৃথক ভোটার তালিকায় রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ১ জন চেয়ারম্যান এবং ৩৩ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। পরিষদ আইনে বলা আছে, প্রত্যেক পরিষদে সংশ্লিষ্ট জেলার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে উপজাতিদের মধ্য থেকে ১ জন চেয়ারম্যান ও ২০ জন সদস্য, অ-উপজাতি ১০ জন এবং সংরক্ষিত তিনটি মহিলা আসনে ২ জন উপজাতি ও ১ জন বাঙালি সদস্য নির্বাচিত হবেন।

প্রতিটি নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। কিন্তু ২৩ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় পরিষদ তিনটিতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতে পারেনি। ১৯৯৬ সালের ৫ আগস্ট নির্বাচিত তিনটি পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রত্যেক পরিষদে ১ জন চেয়ারম্যান ও ৪ জন সদস্য মনোনয়ন দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পাশাপাশি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির শর্তে ১৯৯৮ সালে আইন সংশোধন করে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ থেকে ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে সংশোধিত হয়। এরপর আর নির্বাচন হয় না। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটিতে ১ জন চেয়ারম্যানসহ সদস্য সংখ্যা ৫ থেকে ১৫-তে উন্নীত করে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে সরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও অনুমোদন দিয়ে থাকে পার্বত্য জেলা পরিষদ। সেখানেও চলে নানা অনিয়ম। তাদের মনমতো না হলে অনুমোদন দেওয়া হয় না। সম্প্রতি লংগদুতে দুই কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি রাখার কথা। কিন্তু রাখা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে জেলা পরিষদ থেকে যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই অনিয়ম হয়েছে।

আর অনেকে নিয়োগ পেয়েও স্কুল আসে না। প্রেষণে জেলা শহরে থেকে যায়। ‘বদলা’ দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বদলা হলো একজন শিক্ষকের স্থলে অন্য জন কাজ করবে। একজন শিক্ষক সব মিলিয়ে মাসিক বেতন প্রায় ৪০ হাজার বেতন পান। সেখান থেকে পাঁচ হাজার টাকা যে বদলা খাটে তাকে দেওয়া হয়। একজন শিক্ষক ১০ বছর ধরে একদিনের জন্যও স্কুলে না গিয়ে এভাবে চলেছেন। এতে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাকে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য করা হয়।

এবার নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অতি সম্প্রতি একটি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তাদের লোক নিয়োগপ্রাপ্ত হননি। তবে জেলা পরিষদ তাদের নিয়োগ ৪ থেকে ৫ মাস আটকে রাখে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় জেলা পরিষদ। এদিকে ৬১ জেলার মতো পার্বত্য তিন জেলাতেও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার দাবি অনেকের। এটি শান্তি চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বলেও দাবি করেন তারা। পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্কার আনা না হলে অনিয়ম বাড়তে বাড়তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শান্তি চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে দুই যুগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটে। একই সঙ্গে শান্তি চুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখনো উন্নয়ন কাজ অব্যাহত আছে। ভিশন-২০২১ এ উন্নয়নের ছাপ পার্বত্যাঞ্চলেও থাকবে। সমতল ভূমির মতো পাহাড়েও শিক্ষা ও অবকাঠামোর বিস্তার ঘটেছে। তিনি বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসন হওয়া দরকার। এতে শান্তি চুক্তি নিয়ে কোন সমস্যা হবে না।

ইত্তেফাক/এসআই

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত