মেয়র আইভী ও পরিবারের বিরুদ্ধে দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ

হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে সংহতি প্রকাশ করলো সকল শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিরা
মেয়র আইভী ও পরিবারের বিরুদ্ধে দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী। ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টার অভিযোগ এনে প্রতীকী অনশন করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার নারী পুরুষ।

জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে বুধবার দুপুর ২টা থেকে নগরীর শহীদ মিনারের বেদীতে শুরু হয় এই প্রতীকী অনশন।

এদিকে অনশন কর্মসূচিতে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জের সকল শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিরা। তাদের এই দাবীর প্রতি সহমর্মিতা ও একাত্মতা প্রকাশ করে সেখানে যোগ দিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রায় দেড় ডজন কাউন্সিলর, জাতীয় ভিত্তির ৪টি ব্যবসায়ীক সংগঠনের নেতারা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মুক্তিযোদ্ধা, জেলা আইনজীবী সমিতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নসহ ৬টি সাংবাদিক সংগঠন, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ, জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টি, জেলা ও মহানগর জাসদ, ৭১’এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ নানা সংগঠন।

বুধবার দুপুরের আগেই নগরীর চাষাড়া এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সমবেত হতে থাকেন। এসময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, আওয়ামী লীগের লেবাস লাগিয়ে হিন্দু সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা করে মেয়র আইভী দলকে কলঙ্কিত করেছেন। তিনি ভুলে গেছেন আওয়ামী লীগ জনতার, আর জনতার শেষ আশ্রয়স্থল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেয়র আইভীকে অবশ্যই জনতার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মন্দিরের সম্পত্তি দখলের বিরুদ্ধে আজ মাঠে নামতে হয়েছে এটা এই সরকারের জন্য পীড়া দায়ক।

কর্মসূচিতে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট খোকন সাহা বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে ৩ দফায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। আমি কোন হিন্দু হিসেবে না, এই শহরের এই জেলার একজন সন্তান হিসেবে এখানে এসেছি। রাজনৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমাকে কখনওই সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি হতে হয়নি। আমার মৃত্যুর পর আমার মৃতদেহটির সামনেই হয়তো কোন মুসলিম ভাই বহন করবেন আর পেছনে থাকবেন হিন্দু ভাই। এটাই তো অসাম্প্রদায়িক নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু বড় কষ্ট হয় যখন দেখি আমাদের সরকার আমলে আমাদেরই দলের মেয়র আইভী ও তার পরিবার হিন্দু সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় যখন দেখি জনবিচ্ছিন্ন বামপন্থীরা এই সরকার আর জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কটূক্তি করার দুঃসাহস দেখায় আর এই মেয়র আইভী তাদের সাথে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসেন। কর্মী-সমর্থকদের কাছে তখন লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায় আমাদের। কিন্তু এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না, চলতে দেয়া যাবে না।

খোকন সাহা আরো বলেন, আমি ওয়াদা করছি শুধু মন্দিরের সম্পত্তিই নয়, সে মসজিদ হোক, গির্জা হোক কিংবা প্যাগোডা হোক, যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের সম্পত্তি দখলের বিরুদ্ধে আমি পেশাগত ও রাজনৈতিকভাবে পাশে দাঁড়াবো।

এদিকে অনশন কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. মহসিন মিয়া বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গর্হিত কাজ। ব্রিটিশ পর্চাতেই এই সম্পত্তিটি দেবোত্তর হিসেবে উল্লেখ আছে। প্রচলিত আইনে বা হিন্দু আইনেও দেবোত্তর সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর যোগ্য নয়। আমরা জেলা আইনজীবী সমিতি সভা করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে কোন মসজিদ, মাদ্রাসা, গির্জা,প্যাগোডা, মন্দিরসহ কোন ধর্মীয় উপসানলয়ের সম্পত্তি হরণের অপচেষ্টা হলে আমাদের সাহায্য চাইলে আমরা আইনজীবী সমিতি নিজস্ব উদ্যোগে ও বিনা পয়সায় তাদের পাশে দাড়িয়ে আইনি সহায়তা প্রদান করবো।

মহানগর জাতীয় পার্টির আহবায়ক ও বন্দর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ সানু বলেন, একটি ক্ষুধা মুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টি করতেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালীরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল। আমার এখনও মনে আছে আজ থেকে প্রায় ৬ বছর আগে এই শহীদ মিনার থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বের করে দেয়া হয়েছিল। সেদিন শহীদ মিনারে অনুমতি নেয়ার অজুহাতে জাতির বীর সন্তানদের অনুষ্ঠান করতে দেয়নি মেয়র আইভী। চোখের পানিতে ভিজে মুক্তিযোদ্ধারা চাষাড়া গোল চত্বরে মুখে কালো কাপড় বেধে সেই প্রতিবাদ করেছিল। আজ তার বিরুদ্ধ মন্দিরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং সনাতনী ধর্মাবলম্বী পাশে থেকে আমরা তা প্রতিহত করবে।

৭১’এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা সভাপতি ও ১৬ জুনের বোমা হামলায় চিরপঙ্গু চন্দন শীল বলেন, যে শহরের জন্ম থেকে কবরস্থান, শ্মশান আর খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল একসাথে, সেই শহর অসাম্প্রদায়িকতার স্বাক্ষর বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা দলের আর অসাম্প্রদায়িকতার লেবাস লাগিয়ে মন্দিরের সম্পত্তি দখল করে, মসজিদ-মাদ্রাসার সম্পত্তি দখল করে তারা এই নারায়ণগঞ্জে বসবাসরেই যোগ্য না। তারা চিহ্নিত হয়ে গেছে এবং অচিরেই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।

জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি দীপক কুমার সাহা ও সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার জানান, লক্ষীনারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দিরের নিজস্ব সম্পত্তি জিউশ পুকুরটি গিলে খেতে চাচ্ছেন মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর পরিবার। যেসকল নকল দলিল করে এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে সেইসব দলিলেই মেয়র আইভীর মা, ২ ভাই, মামা, খালাসহ তারই আত্মীয়-স্বজনের নাম রয়েছে। ভোটের সময় মেয়র আইভী হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছের মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে ‘করজোরে নমস্কার’ করেন। অথচ তার পরিবারই এই মন্দিরের তথা দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে আসছে।

তিনি আরো বলেন, ইতিপূর্বে মেয়র আইভীর বাবা প্রয়াত আলী আহাম্মদ চুনকাও আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে জিয়াউর রহমানের আমলে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে এনে সভা করতেন। যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ যে স্কুলের পিন্সিপাল ছিলেন সেই আদর্শ স্কুলের জায়গাও তিনি দখল করে বিক্রি করেছিলেন জামায়াত নেতাদের কাছে। মেয়র আইভী ও পরিবারের এই লেবাসী ভুমিকা আমাদের কাছে অনেক আগেই উন্মোচিত।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত