মানহীন নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরে গেছে রাজশাহী

মানহীন নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরে গেছে রাজশাহী
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে মানহীন অনেক নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২০টি। এগুলোর অবকাঠামো (একাডেমিক ভবন, হোস্টেল), দক্ষ জনবল (শিক্ষক, অফিস স্টাফ), শিক্ষা উপকরণ, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের হাসপাতালসহ নার্সিং শিক্ষার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও গলদ আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীতে ডা. আনিস মালেক নামে একজনের চারটি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার ‘উদয়ন নার্সিং কলেজের বিল্ডিয়েই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড রয়েছে। তার ‘উদয়ন’ ও ‘নগর’ নার্সিং কলেজ এবং ইসলামী ব্যাংক নার্সিং কলেজে চারটি করে (বিএসসি, পোস্ট বেসিক, ডিপ্লোমা ও মিডওয়াইফারি নার্সিং) কোর্স চালু রয়েছে। এ ছাড়া নগরীতে শাহ্মখদুম, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন, বারিন্দ কলেজ অব নার্সিং সায়েন্স, এম রহমান, ক্রিশ্চিয়ান মিশন হাসপাতাল, ডা. জুবাইদা, প্রভাতি, গ্লোবাল, প্রিমিয়ার, জননী, হেলথ কেয়ার, পদ্মা ও মির্জা নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটসহ ২০টি নার্সিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে-বিদেশে দক্ষ নার্সের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখাতে সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি চাকরির বাজারও ভালো। ফলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখন নার্সিং পড়ছে। তাই সরকারি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকার বেসরকারি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের নীতিমালা করেছে। আর সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুবিধাবাদি মহল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, শিক্ষা উপকরণ, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের জেনারেল হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই মানহীন নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের অনুমোদনও দিচ্ছে।

সূত্র মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মৌখিক ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও গলদ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাশ করায় দেশে একাডেমিক নার্সের সংখ্যা বাড়ছে। তবে সুদক্ষ নার্স গড়ে তোলার সরকারি উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অধিকাংশ নার্সের গুণগত মান এতটাই খারাপ যে, অনেকেই রোগীকে ইনজেকশন পুশ করতে পারেন না বলে সরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার কেন্দ্র শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি নার্সিং কলেজ/ইনস্টিটিউটে সীমাবদ্ধ রাখে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল (বিএনএমসি)। এছাড়া খাতা, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা মূল্যায়নে সরকারি নার্সিং কলেজের শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করা হয়। এতে পাশের হার প্রায় শতভাগ থেকে রাতারাতি শতকরা ৩১ দশমিক ১০ ভাগে নেমে আসে। এতে নড়েচড়ে বসে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে পরের বছরই (২০২০-২০২১) নিজ প্রতিষ্ঠানে চূড়ান্ত পরীক্ষার কেন্দ্র নিয়েছেন।

সূত্র জানায়, গতবছর রাজশাহী (সরকারি) নার্সিং কলেজে পরীক্ষা কেন্দ্র থাকলেও এবার আরও পাঁচটি বেসরকারি কলেজে পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। ডা. আনিস মালেকের ‘উদয়ন’ ও ‘নগর’ নার্সিং কলেজই এবার পরীক্ষা কেন্দ্র পেয়েছে। অথচ নগর নার্সিং কলেজের প্রতিষ্ঠা মাত্র এক বছর আগেই। সেখানে ক্লাসের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার কেন্দ্র পেয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক নার্সিং কলেজ, প্রিমিয়ার নার্সিং ইনস্টিটিউট, এম রহমান নার্সিং কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র পেয়েছে। এ ছয়টি কেন্দ্রের জন্য একজন পরিদর্শক ছিলেন। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা অনেক ‘সুবিধা’ পেয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উদয়ন নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ নূশিনা বানু বলেন, এখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। ‘তাহলে গতবার পরীক্ষা কেন্দ্র পাননি কেন?’—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

তবে উদয়ন ও নগর নার্সিং কলেজের মালিক ডা. আনিস মালেক বলেন, নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান চালু এবং বিএনএমসি থেকে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে তার ১৭টি চিকিত্সা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বাণিজ্য ও সেবা-উভয় উদ্দেশ্যেই তিনি এতগুলো প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তার নগর ও উদয়ন নার্সিং কলেজে এবার ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিএনএমসির রেজিস্ট্রার সুরাইয়া বেগম বলেন, কোভিডের কারণে এবার বেসরকারি কলেজেও কেন্দ্র দেওয়া হয়েছে। মানহীন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা কেন্দ্রে অনিয়মের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x