মা বেঁচে আছেন জানতেন না মেয়েরা

মা বেঁচে আছেন জানতেন না মেয়েরা
ময়ফুল বিবি। ছবি: ইত্তেফাক

২০০২ সালের কথা। বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত ময়ফুল বিবি (৭০)। ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া বাজারে এসে আশ্রয় নেন।

অবশেষে ১৯ বছর পর স্থানীয় এক ব্যক্তির একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে রবিবার (১৬ মে) সকালে তিনি স্বজনদের কাছে ফিরে যান। হারিয়ে যাওয়া মাকে দীর্ঘদিন পর ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত তার মেয়েসহ স্বজনরা।

উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের নাটেরকোণা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রোমেল জানান, ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে একদিন ওই নারীকে জারিয়া বাজারে দেখা যায়। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আশ্রয় নেন। সেখানেই তার বসবাস। কখনও ডাকবাংলোর বারান্দা, কখনও বাজারের দোকানপাটের বারান্দা আবার কখনও রেল স্টেশনের প্লাটফরমে তার আশ্রয়। এক সময় একটি দোকানের পিছনে কাপড়, পলিথিন আর চট দিয়ে নিজেই তৈরি করে নেন মাথা গুঁজার ঠাই। তার স্বভাব ও ব্যবহারে স্থানীয় মানুষ তাকে আপন করে নেন। তারাই খাবার দাবার দিতেন। কখনও কখনও তিনি চেয়েও নিতেন। তার নাম ঠিকানা জানতে চাইলে কখনও তিনি বলতেন না। অবশেষে স্থানীয়রা অনেক চেষ্টা করে তার কাছ থেকে নাম ঠিকানা জানতে পারেন। পরে তার স্বজনদের খোঁজে নাটেরকোণা গ্রামের বাসিন্দা ও আওয়ামীলীগ নেতা মো. এমদাদুল হক এমদাদ পূর্বধলা হেল্প লাইন নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তার ছবি ও ঠিকানা শেয়ার করেন। এতে খোঁজ মেলে তার স্বজনদের। রবিবার (১৬ মে) সকালে তার তিন মেয়ের কাছে তাকে তুলে দেওয়া হয়। এলাকার মানুষ তাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যেজন্য প্রথমে তিনি যেতেই চাননি।

তিনি বারবার বলছিলেন, বাড়ি আর এলাকার মানুষদের ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না। পরে কৌশলে তাকে রাজি করানো হয়। এ সময় তার থাকার খুপড়ি জায়গায় খুঁজে বিভিন্ন অংকের নোট ও কয়েনসহ অর্ধবস্তা টাকা পাওয়া যায়। যেগুলো তিনি মানুষের কাছ পেয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গচ্ছিত করছিলেন। পরে ওই টাকাসহ হাড়িপাতিল, কাপড়, সাজসজ্জার জিনিসপত্র তার মেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ময়ফুল বিবির বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা গ্রামে। স্বামীর নাম কাশেম ব্যাপারী। তিনি আগেই মারা গেছেন। তাদের ৬ মেয়ে সন্তান রয়েছে।

তাকে নিতে আসা মেয়ে হোসনেরা বেগম জানান, ২০০২ সালে তার মা মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় কিছু দিন তাকে তাদের নজরে রাখতে পারলেও এক পর্যায়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর থেকে তারা বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজাখুজি করেছেন। কিন্তু না পেয়ে তারা ধরে নিয়েছিলেন এতদিনে হয়ত তাদের মা আর বেঁচে নেই। কিন্তু ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তার মায়ের সন্ধান পেয়ে এ্যাম্বুলেন্সে করে ফেনী থেকে ছুটে আসেন তারা তিন বোন। দীর্ঘ দিন পর তাদের মাকে ফিরে পেয়ে তারা আবেগাপ্লুত। এসময় এক আবগেঘন পরিবেশের সৃষ্টি

হয়। তিন মেয়েসহ উপস্থিত সবার চোখে গড়িয়ে পড়ে আনন্দঅশ্রু। তার স্বজনরা তাকে নিতে আসছেন শুনে এলাকার অনেক মানুষ ছুটে আসেন একনজর দেখার জন্য।

অপর মেয়ে বিবি মরিয়ম জানান, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না দীর্ঘদিন পরে মাকে ফিরে পেয়েছেন। জারিয়াবাসী তার মাকে যেভাবে আগলে রেখে ছিলেন তা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এজন্য তারা মুগ্ধ। তারা জারিয়াবাসীকে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞা জানান।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x