চট্টগ্রামে নিরপরাধ মিনুকে সাজা খাটানোর রহস্য উদঘাটন

চট্টগ্রামে নিরপরাধ মিনুকে সাজা খাটানোর রহস্য উদঘাটন
মিনু আক্তার। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে কুলসুমা আক্তার কুলসুমী নামে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামির পরিবর্তে মিনু আক্তার নামে এক নারীর কারাভোগের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার কুলসুমা রবিবার (১ আগস্ট) চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিন আহমেদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পারভীন নামে এক গার্মেন্টস কর্মীকে গলা টিপে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন কুলসুমা। সাজা এড়ানোর জন্য তিনি মর্জিনা বেগম নামে এক নারীর শরণাপন্ন হন। মর্জিনার মাধ্যমে কথিত ছিন্নমূল নেতা মো. শাহাদাত হোসেন ও নূর আলম কাওয়ালের সঙ্গে কুলসুমার পরিচয় হয়। এরপর মর্জিনার মধ্যস্থতায় শাহাদাত ও নূর আলমের সঙ্গে দেড় লাখ টাকার চুক্তি করেন কুলসুমা। চুক্তি অনুযায়ী মিনু আক্তার নামে এক হতদরিদ্র নারীকে নগদ টাকা ও এক মাসের মধ্যে জামিন করিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুলসুমা সাজিয়ে কারাগারে যেতে রাজী করান শাহাদাত ও নূর আলম। তবে মিনু কারাগারে চলে যাওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী শাহাদাত ও নূর আলমকে দেড় লাখ টাকা দেননি কুলসুমা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছিন্নমূল এলাকায় কুলসুমা ও মর্জিনা বেগমের দু’টি প্লট জোর করে দখল করেন শাহাদাত ও নূর আলম।

এই ঘটনার পর কুলসুমা ও মর্জিনা নগরীর ইপিজেড এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করেন। গত বৃহস্পতিবার ইপিজেড এলাকা থেকে কুলসুমা ও মর্জিনাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই ঘটনায় মিনুকে কুলসুমা সাজিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে সাজা খাটানোর অভিযোগে নগরীর কোতোয়ালি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কুলসুমা ও মর্জিনাকে দুইদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের এসআই মো. জুবায়ের মৃধা ইত্তেফাককে বলেন, রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে আসামীরা। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী শনিবার রাতে অভিযান পরিচালনা করে সীতাকুণ্ড থানার জঙ্গল সলিমপুর কালাপানিয়া দরবেশ নগর এলাকা থেকে শাহাদাত হোসেন ও মো. নুর আলম কাওয়ালকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার আসামীরা জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

এসআই মো. জুবায়ের মৃধা আরও জানান, কুলসুমা ও মর্জিনা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, পারভীন হত্যা মামলায় ১ বছর ৪ মাস হাজতবাস শেষে জামিনে বের হয়ে দীর্ঘ ১০ বছর আদালতে হাজিরা দেয় কুলসুমা। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর মামলায় কুলসুমার যাবজ্জীবন সাজার আদেশ হয়। তবে সাজা থেকে বাঁচার জন্য মর্জিনা বেগমের সাথে আলোচনা করে তার সহযোগিতা চায় কুলসুমা। মর্জিনা বিষয়টি নিয়ে কথিত ছিন্নমূল নেতা মো. শাহাদাত হোসেন ও মো. নূর আলম কাওয়ালের সাথে আলোচনা করে। কুলসুমার পরিবর্তে অন্য কাউকে জেলখানায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেড় লাখ টাকা দাবি করে শাহাদাত ও নূর আলম। এরপর তাদের সহযোগিতায় টাকার লোভ ও এক মাসের মধ্যে জামিন করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মিনু আক্তারের সাথে একটি চুক্তি করে মর্জিনা। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১২ জুন মিনুকে কুলসুমা সাজিয়ে শাহাদাত ও মর্জিনা বেগমের সাথে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে কুলসুমা হিসেবে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে মিনু হাজতে ঢুকে যায়।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২৯ মে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন রহমতগঞ্জ ৮১নং গলির একটি বাসায় মোবাইলে কথা বলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গার্মেন্টস কর্মী পারভিনকে গলাটিপে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে পারভিন আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করেন গার্মেন্টস কর্মী কুলসুমা আক্তার কুলসুমী। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হলেও মামলার তদন্তে এটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়। দীর্ঘ ২ বছর তদন্ত শেষে আদালতে কুলসুমার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর কুলসুমা গ্রেফতার হয়ে ২০০৭ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাজতবাস করেন। মামলার বিচারকার্য চলার সময় প্রায় আটবছর জামিনে মুক্ত ছিলেন কুলসুমা। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষিত হয়। রায়ে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ৪র্থ আদালতের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম আসামী কুলসুমা আক্তার কুলসুমীকে পারভিন হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সহ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x