হাসপাতালের এমডির ভুল চিকিৎসায় বাড়ছে পঙ্গুত্ব-প্রাণহানির শঙ্কা!

হাসপাতালের এমডির ভুল চিকিৎসায় বাড়ছে পঙ্গুত্ব-প্রাণহানির শঙ্কা!
আবদুল্লাহ আল মাঈদ। ছবি: ইত্তেফাক

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের মেডিকা স্পেশালাইজড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডাক্তার আবদুল্লাহ আল মাঈদের ভুল অস্ত্রোপচারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন রোগী ও স্বজনরা। তারা বলছেন, ভুল চিকিৎসা-অস্ত্রোপচারের কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বহুরোগী বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অকারণে অপচয় তো ঘটছেই। এসব অভিযোগ স্বীকার করে অভিযুক্ত চিকিৎসক বলছেন, ‘চিকিৎসা করতে গেলে এমন ভুল হতেই পারে।’

আবদুল্লাহ আল মাঈদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ভাদুর চুনের ব্যাপারী বাড়ির প্রবাসী কামাল বলেন, ‘আমার ৮ বছরের মেয়ের হাতের আঙুলের চিকিৎসা করেন ডাক্তার। কিন্তু তার অপচিকিৎসার কারণে মেয়ের আঙুলে পচন ধরে যায়। এরপরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে গেলেও রক্ষা হয়নি। ডাক্তারের অপচিকিৎসার প্রতিবাদ করতে গেলে তার পক্ষে কিছু প্রভাবশালীর মধ্যস্থতা করতে আসেন। এরপর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু টাকা দিয়ে বিষয়টি রফাদফা করতে বলেন।’

এদিকে, রামগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুমন ভুঁইয়ার অভিযোগ, ‘আমার এক নিকট আত্মীয়ের অপারেশন শেষে গজ ভেতরে রেখেই সেলাই করে দেন ডাক্তার মাঈদ। পরে রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকা নিয়ে গেলে সেখানে অপারেশন করে গজ বের করা হয়। এরপর ১ লাখ চল্লিশ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।’

ভাদুর ইউনিয়নের পল্লি চিকিৎসক জসীম উদ্দিন ছেলের ভাঙা পা নিয়ে আসেন রামগঞ্জ মেডিকা স্পেশাইজড হাসপাতালে। কিন্তু এই হাসপাতালের ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় পা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে তিনি ছেলেকে নিয়ে যান কুমিল্লায়। এসব বিষয় নিয়ে জসীম প্রতিবাদ জানালে আবদুল্লাহ আল মাঈদ নিজের ভুল স্বীকার করে কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে রফাদফা করার চেষ্টা করেন।

রামগঞ্জ নিউ লাইফ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আরিফিন বলেন , ‘আমার এমবিবিএস সনদ পাওয়ার আগে বাবার চিকিৎসা করেন ডা. মাঈদ। একটি ইনজেকশন পুশ করার আগে তাকে বলছিলাম, বাবার এলার্জি আছে। কিন্তু তিনি আমার কথার গুরুত্ব না দিয়ে বাবাকে ইনজেকশন পুশ করেন। এরপরপরই বাবা মারা যান।’No description available.

ডাক্তার মাঈদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ গর্ভবর্তী নারীদের সিজারের ব্যাপারে। রামগঞ্জের একজন আইনজীবীর স্ত্রীর সিজারের সময় তার মূত্রথলী কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠে আবদুল্লাহ আল মাঈদের। পরে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই নারীকে ঢাকা পাঠানো হয়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী থানায় অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিলে আবদুল্লাহ আল মাঈদ মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টির মীমাংসা করেন।

চন্ডীপুর ইউনিয়নের এক গর্ভবর্তী নারীকে নির্ধারিত সময়ের আগেই অপারেশন করা হয়। এতে তার প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তারও ঢাকায় অনেক টাকা পয়সা খরচ করতে হয়েছে। পরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।

পানপাড়ার বেলায়েত মাস্টার বলেন, ‘আমার মেয়ে আফসানা আক্তারের এফেনডি সাইডের ব্যথার জন্য অপারেশন করেন ডাক্তার আবদুল্লাহ আল মাঈদ। সেখানেও করেন ভুল অপারেশন। ৫ দিনের মাথার রোগীর পেটে আবার প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে পুনরায় তিনি অপরেশন করেন। ওই রোগী মেয়েটি এখনো সুস্থ হননি। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন ডাক্তার জানান, ‘ডাক্তার মাঈদের ভুল অপারেশন ও ভুল চিকিৎসায় বহু মৃত্যু হয়েছে। অনেকে অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ডা. মাঈদ ভুল স্বীকার করে বলেন, ‘কিছু সমস্যা হয়েছিল। আবার তা আলোচনা করে সমাধানও করা হয়েছে। চিকিৎসা করতে গেলে এমন হতেই পারে।’ এই সময় তিনি সাংবাদিকদের চায়ের দাওয়াত দেন।

রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা গুণময় পোদ্দার বলেন, ‘মাঈদের বিরুদ্ধে এই ধরনের বহু অভিযোগ শুনেছি। লিখিত পেলে ডা. মাঈদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল গাফফার বলেন, ‘সব কাগজপত্র নিয়ে আসার জন্য ডা. মাঈদকে নোটিশ করা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে মোটেও ছাড় দেওয়া হবে না।’ দোষ প্রমাণিত হলে ডা. মাঈদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এনই/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x