কক্সবাজারে নৌকার প্রার্থী নিয়ে কেন এত বিতর্ক

কক্সবাজারে নৌকার প্রার্থী নিয়ে কেন এত বিতর্ক
মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। ছবি: ইত্তেফাক

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদ নগর ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নিয়ে বিতর্ক উঠেছে।চট্টগ্রাম মহানগরের এক সময়ের ছাত্রশিবিরকর্মী হিসেবে পরিচিত মোয়াজ্জেম মোর্শেদ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ায় এ বিতর্ক উঠেছে।

স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, ২০১৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মীকে অপহরণ ও হামলার মূল হোতা মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। অথচ সেই তিনিই আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়বেন।

এদিকে নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মীরা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রামের ভয়ংকর এক আতংকের নাম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহানগরে শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। ওই ক্যাডারের হাতে একসময় নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির লোকজন মার খেত। তার অত্যাচারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কলেজেও যেতে পারত না। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি মাহামুদুল করিমকে অপহরণ করে টর্চার সেলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালায় শিবির ক্যাডাররা। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ মোয়াজ্জেম মোর্শেদসহ তিনজন শিবির ক্যাডারকে আটক করেছিল। পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে কক্সবাজার যায় ওই ক্যাডার।’

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহামুদুল করিম বলেন, ‘আমি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই। সে সময় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রাম কলেজ শিবিরের অন্যতম নীতি নির্ধারক ও ক্যাডার ছিলেন। আমি কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার কারণে মোর্শেদ আমাকে কয়েক দফা সরাসরি হুমকি দেয়। কিন্তু তার হুমকি না মানায় প্রথমে ২০১১ সালের জুলাইতে আমার ওপর হামলা করে তুলে নিয়ে আমার পা ভেঙে দেয়। সেখানে আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে আমার বাবা মায়ের ঠিকানা নেয়। পরে আমার বাবা-মাকেও হুমকি দেয় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। তাদের কারণে আমি কলেজে নিয়মিত যেতে পারতাম না। ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর আমি পরীক্ষা দিতে গেলে বিকাল ৫ টার দিকে আমাকে হল থেকে তুলে নিয়ে যায় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ ও তার দলবল। প্রথমে আমাকে তারা নির্মাণাধীন স্টাফ ভবনে নিয়ে মারধর করে। এরপর সেখানে লোক জমায়েত হতে শুরু করলে সোহারাওয়ার্দী হলের তখনকার পরিত্যক্ত হিন্দু হোস্টলে নিয়ে আমার আঙুলের নখ তুলে আমাকে গুরুতর জখম করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখে। পরে কয়েকটি থানার পুলিশ পুরো হল ঘেরাও করে আমাকে উদ্ধার করে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে মোয়াজ্জেম মোর্শেদসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ।

তিনি আরও বলেন, ‘রশিদ নগরে নৌকা প্রতীক পাওয়া মোয়াজ্জেম মোর্শেদ আমার ওপর হামলাকারী শিবির ক্যাডার। বিষয়টি কতটা দুঃখজনক বলে বোঝাতে পারব না।’

এদিকে এক সময়ে শিবির ক্যাডার নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় চলছে।

এক সময় চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের রাজনীতি করা ও বর্তমান কক্সবাজার শহর কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসাইন তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের নৌকার মাঝি মোয়াজ্জেম মোর্শেদ সেদিন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল হককে শিবিরের কর্মীদের নিয়ে হত্যা চেষ্টার উৎসবে মেতেছিল, আজ নৌকার মাঝি কেমনে হলো? ধিক্কার জানাই যারা তাকে নৌকার মনোনয়ন দিয়েছে তাদের,,,

চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হোস্টেলে থাকা শিবিরের ক্যাডার যদি নৌকার মাঝি হয়, এটা আওয়ামী লীগের জন্য অশনি সংকেত নয় কি?”

No description available.

এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসটি নেতা-কর্মীসহ অনেকে শেয়ার করেছেন।

সেখানে তিনি লিখেছেন ‘চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছিল শিবিরের দায়িত্বশীল নেতা। কলেজে ছাত্রশিবিরের রাজত্ব চলাকালে মাহমুদুল করিমকে (বর্তমান কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি) ধরে নিয়ে গিয়ে টর্চার সেলে চালায় নির্যাতন। কলেজ শিবিরমুক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে নিজ জেলা কক্সবাজারে ফিরে যায়। এরপরেই দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার থেকে ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে পুনঃজন্ম হয়। আর সে পরিচয় গ্রহণের কয়েকবছরের মধ্যেই রামু উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের জন্য নৌকার মনোনয়ন পেয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে; স্থানীয় নেতারা দুই চার বছরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে কাউকে পছন্দ হলে-তাকে বোন বিয়ে না দিয়ে নৌকার জন্য সুপারিশ করবে কেন?’

No description available.

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোয়াজ্জেম মোর্শেদ বলেন, ‘আমি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছি। তাই এর পরে কী হয়েছে সেখানে আমার জানা নেই। আমি মাহামুদুল করিম নামের কাউকে-ই চিনি না। ওই কলেজে কেউ মোর্শেদ নামে আমাকে চিনে না। সেখানকার সকলে আমাকে জিনান নামে ডাকত।’

তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজার কলেজে অনার্স পরার সময় আমি ছাত্রলীগ করেছি। কক্সবাজার ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি আমার। এছাড়া ২০১৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু আইন ও ছাত্র পরিষদের অ্যাডভোকেট নোমান ও নাজিম কমিটির কক্সবাজার জেলা সভাপতি আমি। কাজেই একটি মহল আমার জয় ঠেকাতেই পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

২০১১ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পরবর্তীতে কলেজ সভাপতি হিসেবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালন করা ওয়াহিদুর রহমান রুবেল বলেন, ‘আমার দীর্ঘ দায়িত্বকালীন সময়ে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এ সময় মোয়াজ্জেম মোরশেদ জিনান নামে কেউ আমাদের কর্মী কিংবা নেতা ছিল না।’

রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামশুল আলম মন্ডল বলেন, ‘ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতারাই মোয়াজ্জেম মোরশেদের নাম প্রস্তাব করে পাঠানো হয়। সেটাই আমরা জেলা আওয়ামী লীগকে ফরোয়ার্ড করেছি। মোয়াজ্জেম নিজে এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছে বলে দাবি করেছে। আমাদের যাচাই করার সুযোগ হয়নি। এখন বিতর্ক উঠে থাকলে আমার খবর নিয়ে দেখছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রামুর রশিদ নগরের মনজুর মোর্শেদের ছেলে মোয়াজ্জেম মোর্শেদ ২০১৭ সালে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদে ৬ষ্ঠ ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। তবে সেখানে কখনো তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি করেননি। কিন্তু জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি আসার পর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইনকে খালাত ভাই দাবি করে নিজেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন।

মোয়াজ্জেমের ছাত্রলীগের রাজনীতি সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘মোয়াজ্জেম মোর্শেদ আমার খালাত ভাই নয়। আমার পাশের ইউনিয়নের ছেলে। আমি সভাপতি হওয়ার পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার চেষ্টা চালায়। আমার নামে বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার ফেস্টুনও দেয়। কিন্তু আমি খবর নিয়ে জানতে পারি তিনি অতীতে কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িতে ছিল না। বরং শিবিরের ক্যাডার হিসাবে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছে বলে প্রমাণ পাই। পরবর্তীতে আমি তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। এছাড়া দলীয় প্রোগ্রামেও তার আসা নিষিদ্ধ করি।’

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x