অর্থাভাবে বন্ধের পথে চবির প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মাফিয়ার লেখাপড়া

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

  রাণীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মাফিয়া। ছবি: ইত্তেফাক

যারা উদ্যমী ও পরিশ্রমী কোন বাধা-বিপত্তিই তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্তর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মাফিয়া। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সেবা করতে চায় সে। কিন্তু তার এই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্রতা। আদৌ কি তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে? সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে? এমন চিন্তায় দিন কাটছে তার।

মাফিয়ার জন্ম নওগাঁর জেলার রাণীনগর উপজেলার খট্টেশ্বর গ্রামে এক হতদরিদ্র ভ্যানচালক আমজাদ হোসেনের পরিবারে। মাফিয়ার পরিবারে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাফিয়াই বড়।

পড়া লেখায় ভাল ফলাফল করে এবার সে ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। কিন্তু অর্থের অভাবে আগামীতে পড়াশুনা চালাতে পারবে কিনা তাই নিয়ে আতংকিত মাফিয়া ও তার ভ্যানচালক পরিবার। উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করে জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন কি মাফিয়ার পূরণ হবে না? সে আর দশজন মানুষের মতো সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না? আর মাফিয়ার এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য প্রয়োজন সমাজের বিত্তবান থেকে শুরু করে সকলে সার্বিক সহযোগিতা। অদম্য মেধাবী মাফিয়া খাতুনের এই সাফল্যের গল্প এখন সবার মুখে মুখে।

আরো পড়ুন: মৃত্যুকুপ থেকে বেঁচে যাওয়া চালকের মর্মস্পর্শী বর্ণনা

পারিবারিক সূত্রে জানা, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অদম্য মেধাবী মাফিয়া। তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হয় তাকে। কিন্তু শিশুকাল থেকেই শিক্ষা জীবনে কখনও হার মানেনি সে। মা আর বাবার প্রেরণায় ও অক্লান্ত সহযোগিতায় শত বাধা আর বিপত্তিকে পেছনে ফেলে সে এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। এর ওর কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, নিজের প্রতিবন্ধী ভাতা আর ভ্যানচালক বাবার ঘাম ঝরানো অর্থ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেও বর্তমানে সেখানে থেকে পড়ালেখা চালানো নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে মাফিয়া ও তার পরিবার। জন্ম থেকেই আর্থিক অনটন আজও মাফিয়ার পিছু ছাড়েনি। তবুও মাফিয়া আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায় আর এর জন্য প্রয়োজন সবার সার্বিক সহযোগিতা।

প্রতিবেশী আবুল কালাম বলেন, মাফিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও দুর্গম মনের মেয়ে। সহজে সে ভেঙ্গে পড়ে না। তা আমরা দেখে আসছি। অনেক যুদ্ধ করে মাফিয়ার বাবা-মা তাকে পড়ালেখা করিয়ে আসছে। আমরাও যতটুকু পারি মাফিয়াকে সহযোগিতা করে আসছি। তবে দেশে বিত্তবানদেন এধরনের মানুষের জন্য বড় ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।


মায়ের সঙ্গে মাফিয়া

মাফিয়ার মা সামেনা বিবি বলেন, ‘আমার এই প্রতিবন্ধী মেয়ের পড়ালেখার জন্য কত জায়গায় গিয়েছি। কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আবার কেউ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমি আমার মেয়ের পড়ালেখার জন্য, তার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য মানুষের বাড়িতে ও জমিতে কাজ করেছি। এতদিন অনেক কষ্ট করে মেয়েকে চালিয়ে নিয়েছি কিন্তু এখন আর পারছি না। আমি আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য সমাজের সবার সহযোগিতা চাই। মাফিয়ার বাবা রিকশা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। মেয়ের পড়া লেখার খরচ দিতে হিমসিম খাচ্ছেন মাফিয়ার বাবা।’

আরো পড়ুন: ভারতে বিষাক্ত মদপানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫০

প্রতিবন্ধী মাফিয়া খাতুন ভাষ্য, ‘সীমাহীন দু:খ আর কষ্ট আমাকে আলাদা করতে পারেনি শিক্ষা জীবন থেকে। প্রাথমিক থেকে সিঁড়ি বেয়ে এবার পা রেখেছি উচ্চ শিক্ষার গণ্ডিতে। অনার্সে ভর্তি হয়েছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। কিন্তু আমি জানি না আগামী দিনগুলো আমার কিভাবে যাবে? পরিবারে রয়েছে আরো কজন ভাই-বোন। ভ্যানচালক বাবা তাদের চালাবে না আমাকে পড়ালেখার খরচ দিবে। মা আর কত দিন আমার জন্য মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করবে। তাই আমি সমাজের বিত্তবান মানুষদের সহযোগিতা কামনা করছি। আমাকে হাত ধরে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’

নওগাঁ জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাফিয়ার ভর্তির সময় আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করেছি। কিন্তু আমাদের সবকিছুতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে আগামীতে তার পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য দেশের বিত্তবানদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইত্তেফাক/বিএএফ