বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭
৩২ °সে

গর্ভবতী হাতিকে আতশবাজি ভরা আনারস খাইয়ে হত্যা

গর্ভবতী হাতিকে আতশবাজি ভরা আনারস খাইয়ে হত্যা
ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা তিন দিন বিচ্ছিন্ন শুঁড় ও ক্ষতবিক্ষত মুখ পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল সেই হাতিটি। শারীরিক যন্ত্রণা থেকে স্বস্তি পেতে মাথা তুলতে চায়নি সে। ময়নাতদন্তে ওই হাতির পেটে বাচ্চারও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য কেরালাতে একটি অন্তঃসত্ত্বা হাতির মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। আনারসের ভেতরে বিস্ফোরক ভরে হাতিটিকে খাইয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

বনকর্মীরা জানিয়েছেন, হাতিটি বন থেকে লোকালয়ে চলে এলেও সে মানুষকে অত্যন্ত বিশ্বাস করত। তাই মানুষের দেওয়া সেই বাজি ভরা আনারস খেয়েও সে লোকালয়ে ছুটে বেড়িয়েছে টানা, কিন্তু কোনও বাড়ি বা মানুষের ছিটেফোঁটাও ক্ষতি করেনি সে। খাবারের অভাবে সে ঢুকে পড়েছিল লোকালয়ে। খাবারের খোঁজ করছিল। আর সেই সময়ই তার মুখে তুলে দেওয়া হয় বাজি ভরতি আনারস। নিজের আর পেটের সন্তানের জন্যে সেই আনারসটি খেয়ে নেয় সে। এরপরই হঠাত তার মুখে বিস্ফোরণ হয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মুখ ও জিভ। অসহ্য যন্ত্রণা এবং খিদে নিয়ে সারা গ্রাম হেঁটে বেড়ায় সে। এই অবস্থায় হাতিটি জল খুঁজছিল। যদি কিছু সুরাহা হয়।

নিজের চেষ্টাতেই খুঁজতে-খুঁজতে হাতিটি পৌঁছে যায় ভেলিয়ার নদী পর্যন্ত। জলের খোঁজ পেয়েই সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ে নদীর মাঝে। আর সেই দাঁড়িয়ে থেকেই মৃত্যু হয় তার। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হাতিটি নদীর জলে শুঁড় এবং মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। যদি মুখ ফেটে যাওয়ার অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি মেলে, যদি পেটের বাচ্চাটা বাঁচে।

বনবিভাগের আধিকারিক মোহন কৃষ্ণন লিখেছেন, ‘মানুষকে বিশ্বাস করাই হাতিটির কাল হল। খাবার খাওয়ার সময় সে হয়ত ভেবেছিল, মানুষ দিচ্ছে যখন নিশ্চয় ভালো হবে। ভাবছিল নিজের আসন্ন সন্তানের কথাও। প্রচন্ড যন্ত্রণা আর কষ্টেও হাতিটি কারও ক্ষতি করেনি। আসলে ওর ভিতরে ভালো ছাড়া আর কিছু ছিল না।’

কৃষ্ণন জানিয়েছেন, অন্য দুটি কুনকি হাতি দিয়ে নদী থেকে এই হাতিটিকে তোলার চেষ্টা হলেও সে কোনও সাড়াশব্দ দেয়নি। কৃষ্ণন বলছেন, 'আমার মনে হয় ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করছিল। মৃত্যু আসন্ন ভেবেই সে আমাদের কিছু করতে দেয়নি।' নদীতে দাঁড়িয়েই শেষ নিঃশ্বাস নেয় সে। মৃত্যুর পর তার দেহ ট্রাকে করে জঙ্গলে নিয়ে যান বনবিভাগের কর্মীরা, সেখানেই দাহ করেন তাকে। কৃষ্ণনের কথায়, 'ডাক্তার ময়নাতদন্ত করে জানান, খুব তাড়াতাড়ি এক সন্তানের জন্ম দিত ও। মরার সময় কী যে কষ্ট হচ্ছিল ওর। মাথা নত করে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম আমরা।'

অবশেষে ২৭ মে নদীতে দাড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই হাতিটি মারা যায়। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের পর জানা যায় যে হাতিটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল।

সাইলেন্ট ভ্যালি নাশনাল পার্কের বন্যপ্রাণী বিভাগের ওয়ার্ডেন স্যামুয়েল ওয়াচা জানান, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। দ্রুত ন্যাক্কারজনক হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টাও চলছে।

ফেসবুকে হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেয় সেই কর্মকর্তা মোহন কৃষ্ণন লেখেন, ও সবাইকে বিশ্বাস করেছিল। আনারসটি খাওয়ার পরে যখন তার মুখের মধ্যে সেটিতে বিস্ফোরণ হল ও নিশ্চয়ই শিউরে উঠেছিল। নিজেকে নিয়ে ভেবে নয়, বরং ওর শরীরে বেড়ে ওঠা প্রাণ, যে আরও ১৮ থেকে ২০ মাস পরে ভূমিষ্ঠ হতো তাকে নিয়ে।

সব দেখে অনেকেই বলেছিলেন, 'প্রকৃতিকে এতদিন ধরে ধ্বংস করেছে মানুষ। আজ তারই ফল ভোগ করছে। মানুষ ঘরে, পশুপাখিরা রাস্তায়।' করোনায় বিপর্যস্ত মনুষ্য সমাজ আদৌ কি প্রকৃতির যত্ন করবে আবার, কেরালার নৃশংস হাতি-হত্যার ঘটনা সেই প্রশ্নটা আরও বড় করে তুলে দিয়ে গেল।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত