বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
২৮ °সে

বেলুচিস্তানে পাক বাহিনীর নির্বিচারে গুম কাণ্ড 

বেলুচিস্তানে পাক বাহিনীর নির্বিচারে গুম কাণ্ড 
ছবি সংগৃহীত

করাচির করাঙ্গি ব্রিজের কাছে গত বছরের ১৪ মে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে অপহরণের শিকার হন মোহাম্মদ নাসিম। ইতোমধ্যে এক বছর পার হয়ে গেল নাসিমের অপহৃত হওয়ার, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার খোঁজের কোন হদিস নেই।

আইনের ছাত্র ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম, এবং অপহৃত হওয়ার আগে তিনি তার স্ত্রী হানি গুলের সঙ্গে বসবাস করতেন। তার স্ত্রী করাচিতে হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন নিয়ে পড়তেন।

নাসিমকে অপহৃত করার কয়েক ঘণ্টা পর হানি গুলকেও তার বাসা থেকে অবৈধভাবে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। করা হয় গুম।

হানির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তাকে হাতকড়া পড়িয়ে, চোখ বেধে একটি অজ্ঞাত আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাস এবং নির্যাতন করা হয়। এর আগে আটক কেন্দ্রে তার স্বামীকে বেধড়ক পেটানো হয় বলে জানান হানি।

বিবিসি উর্দু'কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হানি গুল জানান, তাদের পরিবারকেও অন্ধকারের মধ্যে রাখা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের পরিবারের লোকজনকে ফোন করতে এবং ফোনে তারা কোয়েটা শহরে আছেন এমনটি বলতে বাধ্য করে।

এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তারা হানিকে বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের (বিএলএফ) একজন সদস্য তা জোরপূর্বক স্বীকার করতে বলেন। বিএলএফ বেলুচিস্তানের মুক্তিবাহিনী সংস্থা। এই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে পাকিস্তানের।

তবে হানি ও তার স্বামী নাসিম কেউই বিএলএফ বা বালুচিস্তানের কোন রাজনৈতিক সংস্থার সঙ্গে জড়িত নন বলে অস্বীকার করেন। এবং কোন ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে কোন ধরণের মিথ্যা স্টেটমেন্ট দিতেও অস্বীকৃতি জানান।

বাস্তবতা হল হানি গুল এবং তার গুম হওয়া স্বামী কেউ কোন রাজনৈতিক কর্ম কাণ্ড বা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন।

কয়েক মাস ধরে অবৈধ ভাবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক থাকার পর গত বছরের ১১ আগস্ট হানি গুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। করাচির ইকরা ইউনিভার্সিটির কাছে তাকে ছেড়ে দেয় পাক গোয়েন্দা বাহিনী। সেইসঙ্গে তাকে সর্তক করে দেওয়া হয় অপহরণের বিষয় নিয়ে যেন কোন মুখ না খুলে।

তবে টর্চার ও হুমকির ভয় উপেক্ষা করে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পরেই 'ভয়েস ফর বেলুচ মিসিং পার্সন'র (ভিবিএমপি) প্রটেস্ট ক্যাম্পে যান। সেখানে প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেন এবং গণমাধ্যমে অপহরণের কথা জানান।

হানি গুলের এমন সাহসীকতা বেলুচিস্তান অঞ্চলে বিরল। কেননা প্রদেশটিতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অনেক পরিবারই গুম হয়ে যায়। পরবর্তীতে কেউ আর মুখ খোলার তেমন সাহস পায় না।

বেলুচের প্রখ্যাত লিডার শের মোহাম্মদ মারি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তারা পাঞ্জাবের অনেক পতিতালয় থেকে বেলুচ নারীকে উদ্ধার করেছে।

১৯৭০ এর দশকে বিভিন্ন অভিযানে এসব নারীদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানের বিভিন্ন যায়গা থেকে সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তারা পাঞ্জাবের বিভিন্ন পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়।

বেলুচ নারীদের এমন শত শত ঘটনা দেশটির প্রেসের ওপর খবরদারি ও অনেকে পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে প্রকাশ্যে আসে নি। সেইসঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারদের চুপ থাকার জন্য দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর থাকে কড়া নজরদারি ও চাপ। এজন্য ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে এসব বলতে সাহস পায় না সেইসঙ্গে পাকিস্তান বিচার ব্যবস্থার কাছ থেকে তারা যে কোন বিচার পাবে না তা নিশ্চিত থাকেন।

এ ক্ষেত্রে হানি গুল অন্য পথে হাঁটেন। তিনি এর পরও করাচির সিন্ধু হাইকোর্টে তার স্বামী মোহাম্মদ নাসিমের অপহরণের ব্যাপারে মামলা দায়ের করেন।

তবে প্রত্যাশিতভাবেই সিন্ধু হাই কোর্ট এই মামলার ব্যাপারে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয় নি। বরং হানি গুল দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেক জীবন নাশের হুমকি পাচ্ছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর কথা মত এই মামলা তুলে না নিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে এমন হুমকি দেয়া হচ্ছে, ইতোমধ্যে হানি গুলকে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী গাড়ি দিয়ে দুই বার হত্যা চেষ্টা চালিয়েছে।

এনিয়ে হানি গুল বলেন, আমি বেলুচিস্তানের জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে চাই, আমার কিছু হলে বা আমি গুম হয়ে গেলে এর পেছনে দায়ী থাকবে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী।

তিনি আরও বলেন, আমি চুপ হয়ে যাচ্ছি না, সেইসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম এবং বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক হাজারো ব্যক্তির পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম থেকে পিছপা হচ্ছি না।

ইত্তেফাক/এসআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত