জাহাজ ভর্তি ভয়াবহ বিস্ফোরকের চালান বৈরুতে পৌঁছল যেভাবে

জাহাজ ভর্তি ভয়াবহ বিস্ফোরকের চালান বৈরুতে পৌঁছল যেভাবে
এই সেই জাহাজ , যেটাতে করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বহন করা হয়। ছবিঃ বিবিসি

২০১৩ সালের কথা। সে সময় দুই হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিয়ে এমভি রোসাস জাহাজ লেবাননের বৈরুত বন্দরে পৌঁছে।

এত বিশাল পরিমাণ ভয়ানক দাহ্য পদার্থ ছয় বছরের ওপর কোন নিরাপদ ব্যবস্থা ছাড়া গুদাম ঘরে কিভাবে ছিল তা দেশটির জনগণ বিশ্বাস করতে পারছে না। এ জন্য তারা ক্ষোভে ফুঁসছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়, যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে বন্দর নগরীর বিস্তীর্ণ জনপদ তার উৎসের নাম বলছে না সরকার। কিন্তু এটা জানা যাচ্ছে যে মলডোভিয়ান পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ এমভি রোসাস ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিয়ে বৈরুতে নোঙর করেছিল।

জাহাজটি রাশিয়ান মালিকানাধীন জর্জিয়ার বাটুমি থেকে যাত্রা শুরু করে। সেটির গন্তব্য ছিল মোজাম্বিকের বেইরা।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব ভূমধ্যসাগর দিয়ে যাওয়ার সময় রোসাস জাহাজটিতে কারিগরি ত্রুটির জারনে বৈরুত বন্দরে নোঙর করতে বাধ্য হয়।

২০১৫ সালে এই তথ্য এসেছে জাহাজ শিল্পের সাথে জড়িত একটি প্রতিবেদনে। যেটি শিপিং অ্যারেস্টেড ডটকম নামে একটি নিউজলেটারে প্রকাশিত হয়েছিল।

সে সময় বৈরুত বন্দরের কর্মকর্তারা জাহাজটি পরিদর্শন করেছিলেন। সেটিকে সমুদ্র যাত্রার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন বলে জানাচ্ছেন আইনজীবীরা।

জাহাজের বেশিরভাগ কর্মীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাঠানো হয়নি শুধু জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন বরিস প্রোকোশেফ এবং আরও তিনজনকে, যারা ইউক্রেনিয়ান বলে বলা হয়।

জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রোকোশেফ বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, রোসাস-এ লিকেজের কিছু সমস্যা হচ্ছিল কিন্তু জাহাজটির সমুদ্র যাত্রার জন্য কোন সমস্যা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, জাহাজটির মালিক জাহাজটিকে বৈরুতে পাঠান সেখান থেকে ভারী যন্ত্রপাতির বাড়তি কিছু মাল জাহাজে তোলার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল দেশটির অর্থনৈতিক অসুবিধার মধ্যে তাদের সহায়তা করা। কিন্তু জাহাজের কর্মীরা ওইসব ভারী যন্ত্রপাতি নিরাপদে জাহাজে তুলতে পারেনি।

এরপর জাহাজের মালিক বন্দরের ভাড়া দিতে ব্যর্থ হন। তখন লেবানন কর্তৃপক্ষ জাহাজটি সেখানে জব্দ করে।

এর অল্প কিছুদিন পর, মালিক জাহাজটি পরিত্যাগ করেন।

ইতোমধ্যে জাহাজের ভেতর তখনও যেসব নাবিক ও কর্মী ছিলেন তাদের খাবার দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।

আইনজীবীরা বলেছেন, তারা বৈরুতের জরুরিকালীন বিচারকের কাছে আবেদন করেন, যাতে ঐ ক্রুদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওর অনুমতি দেওয়া হয়। বিচারক শেষ পর্যন্ত ক্রুদের জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেন।

এরপর ২০১৪ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজ থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের চালান ১২ নম্বর ওয়্যারহাউস এ স্থানান্তরিত করেন। ওই গুদামঘরটি ছিল বিশাল শস্য গুদামগুলোর পাশে।

জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রোকোশেফ বলেন, ওই রাসায়নিক ছিল বিস্ফোরক পদার্থ। সে কারণেই আমরা যখন জাহাজে ছিলাম সেগুলো জাহাজের মধ্যেই রাখা ছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের দায়ীদের শাস্তি হওয়া উচিত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তখন এ সব নিয়ে ব্যবস্থা নেয়নি।

তবে বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সেখান থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সরিয়ে ফেলার জন্য আগেই অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন।

বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার হাসান কোরায়েতেম বলেন, তারা বিচারবিভাগকে সেখানে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত রাখার বিপদ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে এগুলো সরিয়ে ফেলার বারবার বলেছেন।

মঙ্গলবার অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ওই গুদামে আগুন থেকে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই বিস্ফোরণে অন্তত ১৩৭ জন এখন পর্যন্ত মারা গেছেন, আহতের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। আরও বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত