ট্রাম্প-বাইডেন কটাক্ষপূর্ণ বিতর্কে মার্কিনিরা হতাশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০
ট্রাম্প-বাইডেন কটাক্ষপূর্ণ বিতর্কে মার্কিনিরা হতাশ
ছবি: সংগৃহীত

নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বুধবার (বাংলাদেশ সময়) প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হন রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। কিন্তু এই বিতর্কে একে অপরের বক্তব্যের মধ্যে বাধা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটাক্ষ দেখে হতাশ হয়েছেন প্রায় ১০ কোটি আমেরিকান। অনেক মার্কিনির মতে, নির্বাচনি বিতর্কের ইতিহাসে সম্ভবত এবারই ‘সবচেয়ে খারাপ’ বিতর্কের সাক্ষী হলেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডের ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের এই বিতর্ক দেখতে উন্মুখ ছিলেন মার্কিনিরা। সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকায় বিশ্ববাসীর কাছেও এই বিতর্ক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ট্রাম্প ও বাইডেনের বিতর্ক প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু আমেরিকার জনগণকে হতাশ করেছে প্রথম বিতর্ক। কে জয়ী হলো সেই হিসাব না কষে তাদের অনেকেই বলছেন, এই বিতর্কে আমেরিকার জনগণের পরাজয় হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে মঞ্চে দুই প্রার্থী দূর থেকে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও সরাসরি করমর্দন করা থেকে বিরত থাকেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ফক্স নিউজ সানডের উপস্থাপক ক্রিস ওয়ালেস প্রথমেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়ে প্রশ্ন করেন ট্রাম্প ও বাইডেনকে। কিন্তু শুরুতেই ট্রাম্পের আচরণে অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। শান্ত স্বভাবের বাইডেন কিছুটা নমনীয় থাকলে তার দু-একটি উক্তি ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ আচরণকে ছাড়িয়ে যায়। ট্রাম্প বারবার তার কথায় বাধা দিলে ট্রাম্পকে তিনি ‘শাটআপ ম্যান’ বলে থামতে বলেন। এমনকি বাইডেন তার বক্তব্যে ট্রাম্পকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘পোষা কুকুরছানা’ বলেও কটাক্ষ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশে বাইডেন আরো বলেন, ‘এই জোকারের কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করা শক্ত।’

অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে সঞ্চালক ক্রিস ওয়ালেসও একসময় চিত্কার করে ওঠেন। তিনি বলে ফেলেন, চিত্কার করাকে তিনি ঘৃণা করেন। ৯০ মিনিটের এই বিতর্কে দুই প্রার্থীকে পর্যায়ক্রমে সুপ্রিম কোর্ট, স্বাস্থ্যবিমা, করোনা ভাইরাস, অর্থনীতি, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও নির্বাচনের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যান। ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় পাশ থেকে নিচু স্বরে বাইডেনকে ‘মিথ্যা’ কখনো ‘মিথ্যাবাদী’ বলতে শোনা যায়। তবে বাইডেনের পুরো সময়ের উত্তরে হস্তক্ষেপ করেন ট্রাম্প। সঞ্চালক ট্রাম্পকে চুপ থাকার অনুরোধ করলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় এ পর্যন্ত ২ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। করোনা রোধে মাস্ক পরায় বাইডেনের উত্সাহ নিয়ে কটাক্ষ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে মাস্ক রয়েছে। যখন প্রয়োজন হয় তখন আমি মাস্ক পরি।’ বাইডেনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমি তার মতো মাস্ক পরি না। যখনই তার দিকে তাকাবেন দেখবেন মাস্ক পরে আছেন।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুথ গিনসবার্গের মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে নতুন বিচারপতি নিয়োগের প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, তিনি চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সিনেটও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অতএব, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদে যা যা করার তিনি তা-ই করছেন। জবাবে বাইডেন বলেন, নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ১০ হাজার আমেরিকান ডাকযোগে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনের রায় যার পক্ষে যাবে, তিনি পরবর্তী বিচারপতি নিয়োগ দেবেন।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে ট্রাম্প মাত্র ৭৫০ ডলার করে ব্যক্তিগত আয়কর দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এসব ফেক নিউজ। তিনি ৩৮ মিলিয়ন ডলার আয়কর দিয়েছেন। এ নিয়ে কথা এগিয়ে নেওয়ার আগেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যান সঞ্চালক ক্রিস ওয়ালেস।

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, নির্বাচনের অখণ্ডতা, স্বাস্থ্যবিমা ও করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে নানান প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প নির্বিচার বক্তব্য দেন। এ প্রসঙ্গে বাইডেন যা-ই বলতে চেয়েছেন তাতে বাধা দিয়েছেন ট্রাম্প। কখনো আবার বাইডেন ও তার ছেলেকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ট্রাম্প বলেন, তিনি গত চার বছরে যে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট তা করতে পারেনি। নির্বাচিত হলে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমেরিকাকে আরো মহান করবেন তিনি।

অন্যদিকে বাইডেন বলেছেন, ট্রাম্প গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নাজুক করেছেন। মানুষ বেকার হয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করবেন। মানুষের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনবেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা করণীয় তা-ই করবেন। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ৭০ ভাগ আমেরিকান রাজনৈতিক বিবেচনায় ভোট দেন। ৩০ ভাগ আমেরিকান অর্থাত্ সিদ্ধান্তহীন, স্বতন্ত্র ও দোদুল্যমান ভোটাররা প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক দেখে সিদ্ধান্ত নেন তারা কাকে ভোট দেবেন। সেই বিবেচনায় নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মঙ্গলবারের প্রথম বিতর্ক তাদের হতাশায় ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্প ও বাইডেনের এই বিতর্ককে বিশৃঙ্খল বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি নানা শ্রেণিপেশার মানুষেরা বলছেন, তাদের দেখা সবচেয়ে খারাপ একটি বিতর্ক। এই বিতর্ক দেখে শেখার কিছু নেই।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান অ্যাটর্নি ও শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্রেটিক লিডার মঈন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, জো বাইডেন বিতর্কে অনেক ভালো করেছেন। ট্রাম্প বারবার তার কথায় হস্তক্ষেপ করেছেন। এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের এই আচরণে জো বাইডেনের ভোট বাড়বে নিঃসন্দেহে।

রিপাবলিকান সমর্থক ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ইন্টারফেইথ লিডার ও ইমাম কাজী কাইয়ুম ইত্তেফাককে বলেন, ট্রাম্প আবার নির্বাচিত হবেন। তিনি ট্যাক্সের বিষয়ে কোনো মিথ্যা তথ্য দেননি। আরেক রিপাবলিকান সমর্থক বাংলাদেশি কমিউনিটি লিডার ওয়াসি চৌধুরী বলেন, বিতর্কটি খুব প্রাঞ্জল ছিল না। তবে পরবর্তী বিতর্ক জমে উঠবে।

নিউ ইয়র্কের সেন্ট জোনস ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী লিসা এলিভেরা বিতর্ক নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গত নির্বাচনের বিতর্কের সঙ্গে এই এই বিতর্কের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই বিতর্কে আসেনি বলে তার মতামত।

আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় বিতর্ক। এটি অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের মিয়ামি আদ্রিয়ান পারফরমিং অব আর্টস সেন্টারে। ২২ অক্টোবর টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলের বেলমন্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হবে তৃতীয় ও সর্বশেষ বিতর্ক। নির্বাচন হবে ৩ নভেম্বর।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত