মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বায়তুল হিকমা

মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বায়তুল হিকমা
মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বায়তুল হিকমা। ছবি: সংগৃহীত

অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সাড়া জাগানো ও প্রভাবশালী জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র বায়তুল হিকমা, যাকে হাউজ অব উইজডম বা জ্ঞানের ভান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে যাত্রাপথ শুরু হলেও ক্রমেই তা গবেষণাকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানমন্দিরে পরিণত হয়েছিল। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আব্বাসীয় শাসনামলে। খলিফা হারুন-অর-রশিদ আব্বাসীয় রাজধানী বাগদাদে এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার পুত্র খলিফা আল-মামুন ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে সেটির পূর্ণতা দান করেন। সিরিয়ান খ্রিষ্টান হুনায়ন ইবনে ইসহাককে বায়তুল হিকমার মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তত্কালীন মুসলিম সভ্যতার রাজধানী বাগদাদ ছিল পৃথিবীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির লালনক্ষেত্র। আব্বাসীয় খলিফা আল মুনসুর সে সময় বইয়ের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট ছিলেন এবং বই সংগ্রহ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হারুন-অর-রশিদ বই সংগ্রহ করে সেটিকে একটি লাইব্রেরি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তখন এর নাম ছিল ‘খিজানাতুল হিকমাহ’। পরে মামুনের সময় এটির সংগ্রহশালা এতই বৃদ্ধি পায় যে তিনি এই ভবন বিশাল আকারে সম্প্রসারণ এবং বিষয়ভিত্তিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

খলিফা মামুনের সময়ই সারা বিশ্বে বায়তুল হিকমার খ্যাতি অগ্নিদীপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বিশ্বের বিদ্বান ব্যক্তিদের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে এটি পরিচিতি লাভ করে। নারী-পুরুষনির্বিশেষে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন জাতির পণ্ডিতদের সম্মেলন ঘটেছিল এই প্রতিষ্ঠানে। মামুনের সময় বায়তুল হিকমার তিনটি বিভাগ ছিল। যথা :ক. গ্রন্থাগার খ. শিক্ষায়তন এবং গ. অনুবাদকেন্দ্র। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার এই বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে বহু অনুবাদক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গের সমাগম ঘটেছিল। এখানে কাজ করতেন এমন বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন—জাফফার মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির, অ্যারিস্টটলের রচনাবলির অনুবাদক আরবদের দার্শনিকরূপে পরিচিত আল-কিন্দি, হিপোক্রিটাসের অনুবাদক হুনায়ন ইবনে ইসহাক, সাইদ বিন হারুন, সাবিত বিন ফেরা, উমর বিন ফারুখান আল বিবার, বিশিষ্ট গণিতবিদ আল খয়ারিজিমি প্রমুখ। এসব মুসলিম পণ্ডিত প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, রোমান, চীনা, ভারতীয়, পারসি, মিশরীয়, উত্তর আফ্রিকীয়, গ্রিক ও বাইজান্টানীয় সভ্যতা থেকে বহু মূল্যবান গ্রন্থ সংগ্রহ করেন এবং অনুবাদের মাধ্যমে সংকলন করেন। আরবি ছাড়াও গ্রিক, ফরাসি, আরমাইক, হিবরু, সিরিয়াক, লাতিন, ভারতীয়সহ বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থগুলো অনুবাদ করা হয়। প্রথম দিকে দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা হলেও কালক্রমে বিজ্ঞান, চিকিত্সা, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, ভূগোল, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্য ও জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হতো।

বায়তুল হিকমার অন্যতম বিষয় ছিল মানমন্দির ও মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। পরে বায়তুল হিকমার সঙ্গে মানমন্দির যুক্ত করা হয় এবং খ্যাতিমান জ্যোতির্বিদ ইয়াহিয়াসহ অনেকেই মানমন্দিরে গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন; যা ভারতীয়, গ্রিক ও পার্সিয়ানদের থেকে অনেকটাই স্বতন্ত্র ছিল। এসব মুসলমান ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমে বিশ্বের সামনে উঠে আসে অ্যারিস্টটল ও হিপোক্রিটাসের মতো দুর্দান্ত দার্শনিক উক্তি এবং পিথাগোরাস, প্লেটো, ইউক্লিড, প্লাটিনাস, গ্যালন, চরক, আর্যভট্ট ও বহ্মগুপ্তের লেখাসহ বহু জ্ঞানীকুলের গ্রন্থ অনুবাদ করা হয়, যারা আজকে বিজ্ঞানের দুনিয়ায় উজ্জ্বল মুখ। মুসলমান পণ্ডিতেরা যদি সে সময় এসব মূল্যবান গ্রন্থ সংগ্রহ ও অনুবাদ করে সারা বিশ্বের প্রান্তে ছড়িয়ে না দিতেন, তাহলে আজকের এই সোনালি বিজ্ঞান কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বে বায়তুল হিকমার প্রভাব তৈরিতে খলিফা মামুন অনুবাদকদের উত্সাহিত করার জন্য অনুবাদের বিনিময়ে অনুবাদকর্মের ওজনের স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করতেন।

১২৫৮ সালে হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণের সময় দীর্ঘ ১২ দিন অবরোধের পর খলিফা মুতাসিম বাধ্য হয়ে মোঙ্গলদের কাছে নতি স্বীকার করেন। অতঃপর মোঙ্গলরা বাগদাদে প্রবেশ করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। সাধারণ জনগণ ও খলিফাসহ পুরো শহর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হয়। মোঙ্গলদের হাতে আব্বাসীয় আমলের দীর্ঘ ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে জ্ঞানবিজ্ঞানের সোনালি ধারা বজায়ের আলোকবর্তিকা বায়তুল হিকমাহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কথিত রয়েছে, হত্যাকাণ্ড চলার সময় যদিও পারস্য মনীষী নাসিরুদ্দিন তুসি ৪০ হাজার গ্রন্থ অনত্র সরিয়ে নেন, তবু এত বিপুল পরিমাণ বই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় যে বইয়ের কালিতে আব্বাসীয় প্রাসাদসংলগ্ন টাইগ্রিস নদীর পানি কালো হয়ে যায়। হালাকু খানের হাতে বায়তুল হিকমা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ৩২ জন খলিফার সবাই এটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

বায়তুল হিকমাই মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং এর মধ্য দিয়েই জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গবেষণার আধুনিক ধারণার উদ্ভব ঘটে। বায়তুল হিকমার গবেষণাকর্মকে কেন্দ্র করেই মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চার অনুশীলন এবং পরে ইউরোপীয় রেনেসার সূচনা ঘটে। শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বরং সারা বিশ্বে বায়তুল হিকমাহই ছিল প্রথম ও সর্ববৃহত্ প্রতিষ্ঠান।

লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/টিআর

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত