ক্ষোভে ফুঁসছে মিয়ানমার

ক্ষোভে ফুঁসছে মিয়ানমার
ছবি: সংগৃহীত।

মিয়ানমারে সেনাশাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার পর প্রায় পাঁচ দশক দেশটি শাসন করেছে জান্তা সরকার। ১৯৬২ সালে বেসামরিক প্রশাসন বাতিল করেন জেনারেল নি উইন। এরপর টানা ২৬ বছর সামরিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৮৮ সালে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন নি উইন।

সর্বশেষ ২০১১ সালে জান্তা সরকারের নেতা জেনারেল থান সুয়ে পদত্যাগ করেন। দেশের সংবিধান মেনে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়েন তিনি। কিন্তু এর আগে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের সংবিধান সংশোধন করে সেনাবাহিনীকে প্রবল রাজনৈতিক ক্ষমতা দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর হাতে স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। পার্লামেন্টে নির্ধারিত আসনের এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির সেনাবাহিনী।

দশকের পর দশক সেনাশাসনের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মিয়ানমার। এ অবস্থায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী নামমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরতে চাইছিল।

২০১১ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার উত্তরণ ঘটে। ২০১২ সালের নির্বাচনে সু চির এনএলডি বিরোধী দল হলেও ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করে তারা ক্ষমতায় আসে। গত বছরের নভেম্বরের নির্বাচনে জয় লাভ করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠনের অনুমোদন পায় সু চির দল এনএলডি। সোনারা ভেবেছিল যে, সু চির দল ক্ষমতায় এলেও নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। কিন্তু সু চি প্রেসিডেন্ট না হয়েও যে মিয়নামারের কার্যত সরকারপ্রধানে পরিণত হবেন, সেটা তাদের পরিকল্পনায় ছিল না। তার পরও সু চির নেতৃত্ব সহ্য করেছে সেনারা। কিন্তু তার দল আবারও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে, সেটা তারা মানতে পারেনি।

গত ১ ফেব্রুয়ারি সু চির দলের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর কথা ছিল, কিন্তু পার্লামেন্ট অধিবেশনের কয়েক ঘণ্টা আগেই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উ উইন মিন্টসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। ইতিমধ্যে সু চির বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে।

জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক বছরের জরুরি অবস্থা শেষে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু সু চি এই অভ্যুত্থান মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অন্তত ১৫ বছর গৃহবন্দি জীবন কাটিয়েছেন।

অভ্যুত্থানের পরপরই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিবাদ দেখা যায়নি। শুরুর দিকে এই প্রতিবাদ ছিল সীমিত আকারের। দুই দিনের মাথায় বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে ঘরের মধ্যে হাঁড়ি-পাতিল বাজিয়ে এবং রাস্তায় গাড়িতে হর্ন বাজিয়ে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায় সাধারণ জনতা। তখনো বিক্ষোভ হয়নি রাস্তায়। এরপর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দেশটির ৭০টির মতো হাসপাতালের চিকিত্সক ও কর্মীরা সু চির মুক্তি ও গণতন্ত্রে ফেরার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করে। একে একে এই বিক্ষোভে যোগ দেন শিক্ষক, বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্য, কবি, পরিবহন শ্রমিকেরাও। এখন বিক্ষোভ শুধু নেপিডো, ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্ষোভ হচ্ছে দেশটির ছোট-বড় প্রায় সব শহরে।

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে এখন পর্যন্ত তিন জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানী নেপিডোতে পুলিশের গুলিতে আহত হন ২০ বছরের তরুণী মিয়া থোয়ে থোয়ে খাইন। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর তিনি ১০ দিন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তার মৃত্যুতে মিয়ানমার জুড়ে শোক বিরাজ করছে। গত শনিবার বিক্ষোভে আবারও গুলি চালায় পুলিশ। মান্দালয়ে পুলিশের গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হন। আহত হন ২০ জন।

এর আগে ১৯৮৮ এবং ২০০৭ সালে দেশটির কয়েক দশকব্যাপী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯৮৮ সালের বিক্ষোভে কমপক্ষে ৩ হাজার বিক্ষোভকারী মারা যান আর ২০০৭ সালে নিহত হন ৩০ জন। সে সময় হাজার হাজার মানুষকে কারাবন্দি রাখা হয়। জান্তা সরকারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে প্রতিদিনই মিয়ানমারে প্রতিবাদ বিক্ষোভে জনতার অংশগ্রহণ বাড়ছে। ক্ষোভে ফুঁসছে মিয়ানমার। জনতার দাবিতে অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমার গণতন্ত্রে ফিরতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x