কীভাবে হতে পারে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব নিরসন

কীভাবে হতে পারে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব নিরসন
বামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বামে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি ঘটে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জো বাইডেন ক্ষমতায় এলেও কতটা পরিবর্তন তার সময়ে হবে, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়। বাণিজ্য ছাড়াও প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বিবাদ তৈরি হচ্ছে, যা নিরসনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে আশু কোনো পরিবর্তন আনছে না।

বিভিন্ন ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ ঘনীভূত হচ্ছিল। দুই দেশের কর্মকর্তাদের আচরণ ও কথাবার্তা থেকেও এটি স্পষ্ট। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যত্ সম্ভবত ২০২০-এর দশকটি ঠিক করে দেবে। দেশ দুটি যেভাবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়াতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যেন না বাধে, সে ব্যাপারে বেইজিং ও ওয়াশিংটন সতর্ক আছে। এটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে কিন্তু পরিস্থিতি অন্তত সে পর্যায়ে যাবে না।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) মনে করে এই দশকের শেষ নাগাদ চীনের জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা তা মনে করেন না। কারণ তাদের কাছে জিডিপির আকারই অর্থনীতির একমাত্র সূচক না। মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোও এর মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে চীনাদের কাছে আকার একটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারকে তারা এখন চ্যালেঞ্জ করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

চীন যুক্তরাষ্ট্র দ্বৈরথ কেবল অর্থনীতি কেন্দ্রিক নয়। প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটি প্রসারিত হচ্ছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির সবক্ষেত্রে নেতৃত্বের পর্যায়ে যাওয়া। ২০৩৩ সালের মধ্যে সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নের লক্ষ্যমাত্রা আগে ঠিক করা হয়েছিল। সেটি এখন এগিয়ে ২০২৭ সাল করা হয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক বিরোধের সম্ভাব্য সব ধরনের পরিণতির জন্য তৈরি হচ্ছে চীন। তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ করা সিসিপি পলিট ব্যুরোর একটি স্বপ্ন। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এটি করতে পারলে ইতিহাসে মাও জে ডংয়ের সমান উচ্চতায় তিনি যেতে পারবেন বলে পার্টি মনে করে।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটনকে অল্প সময়ে একটি করণীয় ঠিক করতে হবে। শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকলে অন্যান্য দেশের তাদের পাশে দাঁড়ানোর সম্ভবনা কম। এ লড়াই তাদের একাই করতে হবে। সেজন্য বেইজিং ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলকে একটি সমাধান বের করতেই হবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ তাদের বিরোধকে পাশ কাটিয়ে সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিতে কোনো ফর্মুলা বের করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনেকের সংশয় আছে।

দেশ এক্ষেত্রে শীতল যুদ্ধকালীন মার্কিন-সোভিয়েত সম্পর্কের ধারা অনুসরণ করতে পারে। উভয় দেশ ১৯৬০ এর দশকের গোড়ায় যুদ্ধের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ এড়াতে একটি আপস রফায় আসে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও যুদ্ধ বাধার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। তাই শেষ মুহূর্তের কথা চিন্তা করার গরজ কেউ করছে না।

বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ ফেব্রুয়ারি চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে প্রথম ফোনালাপে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, হংকংয়ে বিক্ষোভ দমন এবং তাইওয়ান নিয়ে তার দেশের উদ্বেগের কথা জানান। জবাবে শি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অবনতিশীল সম্পর্ক দুদেশের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। চীনের চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষ্যে কলটি করা হলেও দুই নেতার কথায় মতপার্থক্যই প্রাধান্য পায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাইডেনের অভিযোগগুলো যথারীতি প্রত্যাখ্যান করে।

চীন বিগত কয়েক দশকে নিজস্ব নীতি ও কলাকৌশল যেভাবে ঠিক করেছে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি সেরকম গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি বলে মনে হয়। বরং ওয়াশিংটনের দিক থেকে এখন কী করণীয় সেটার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। সদ্য সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত বছর জুলাই মাসে এক বক্তৃতায় চীনে শাসক পরিবর্তনের জন্য সে দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জনগণকে পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন ইস্যু আছে। যেমন—বেকারত্ব, পরিবেশ বিপর্যয় বিশেষ করে মহামারি ইস্যু, এছাড়া ভিন্ন মত দমন। ঐ পথে না গিয়ে সরাসরি শাসক পরিবর্তনের ডাক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। চীনে জনমত সংগঠনের সম্ভাবনা যতটুকু ছিল সেটি আর না-ও থাকতে পারে। গত শতাব্দীর শেষার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় বিভিন্ন দেশে শাসক পরিবর্তন হয়েছে। এগুলো এখন অতীতের বিষয়। বর্তমানে শাসক পরিবর্তনের ধারণাটি জনপ্রিয় নয়।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x