পূর্ব এশিয়ায় করোনা ভয়াল হয়নি কেন!

পূর্ব এশিয়ায় করোনা ভয়াল হয়নি কেন!
ছবি: সংগৃহীত

তাইয়ান থেকে জাপান, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে মোটামুটি সফল। করোনা ভাইরাসের উত্পত্তিস্থল এ অঞ্চলে হলেও এশিয়া-প্যাসিফিকে এর বিস্তার খুব ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। ২০০২ সালে সার্স মহামারির অভিজ্ঞতা সম্ভবত এ ক্ষেত্রে কাজ দিয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাস্ক ব্যবহার করেছে, পশ্চিমা অনেক দেশে বিশেষজ্ঞরাই এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় পোষণ করেছিলেন। বিশ্বের অন্য অঞ্চলের মতো পূর্ব এশিয়াতেও বহুলোক কর্মহীন হয়েছে

ধনী দরিদ্রের বৈষম্য ও অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি লালিত বিরূপ সামাজিক ধারণার মতো বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মহামারি। পূর্ব এশিয়ায় করোনা ভয়াল রূপ ধারণ না করার জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।

তাইওয়ানের চীনা ভীতি

সার্স মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তো ছিলই, সর্বোপরি চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি অনাস্থা তাইওয়ানে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রেরণা যুগিয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনার বিস্তৃতি শুরু হলেও ফ্রেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা তেমন দেখা যায়নি। কিন্তু তাইওয়ান ছিল প্রথম দেশ যেখানে উহান থেকে ফ্লাইট আগমন নিষিদ্ধ করা হয়। তাইওয়ান তাত্ক্ষণিকভাবে মাস্ক উত্পাদন বাড়িয়ে দেয়। চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতা ছাড়াই তাইওয়ান করোনা বিস্তার রোধ করে। বিদেশ ফেরত প্রত্যেকের ডাটাবেস যথযথভাবে সংরক্ষণ করে। সব মিলিয়ে চীনের মতো একটি বৃহত্ বৈরী শক্তির নৈকট্য তাইওয়ানকে নিজের ক্ষমতার ওপর ভরসা করার প্রেরণা জুগিয়েছে।

নিরাপদ জাপান

করোনা ঠেকাতে খুব একটা তত্পর হয়নি জাপান। তারপরও দেশটিতে মহামারির বিস্তার বেশি ঘটেনি। সরকার জোর করে জনগণকে ঘরে থাকতে বাধ্য করেনি। কেবল সাধারণভাবে স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছিল। এতটুকুই করোনা মোকাবিলায় যথেষ্ট বিবেচিত হয়। মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন কিছু ছিল না। এটি তাদের অনেকটা সহজাত। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অভ্যাসটি রপ্ত করেছে জাপানিরা। তবে ডিসেম্বরে দেশটিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে নতুন ধরনের ভাইরাসের ঘটার জের জাপানের ওপর পড়ে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা লোকজনের মাধ্যমে এটি হয়।

কোয়ারেন্টাইনে সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ বাইরে থেকে আসা সবার জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। পাশাপাশি নির্দেশ দেওয়া হয় বিদেশগামী ও ফেরতদের স্বাস্থ্য নজরদারির জন্য মোবাইলে বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করার। মালয়শিয়ায়ও করোনার প্রাথমিক পর্যায়ে সফল হয়। বছরের শেষ দিকে দ্বিতীয় প্রবাহ শুরু হলে প্রাদুর্ভাব কিছুটা টের পাওয়া যায়। সাফল্য সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের সামাজিক বঞ্চনার অবসান ঘটেনি। অভিবাসীরা শ্রমিকরা সেখানে বরাবরই অবহেলিত। অভিবাসীরা শ্রমিকরা সেখানে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকে। যে কারণে তাদের করোনা বিস্তারের কারণ বলেও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে।

দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার করোনা মোকাবেলায় সফলতা উল্লেখযোগ্য। দেশটি মহামারি প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। খ্রিষ্টানদের উপদল শিনচেয়োঞ্জি সদস্যদের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে ভাইরাস কিছুটা ছাড়ায়। তবে চার্চ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং করোনা বিস্তার রোধে ভূমিকা রাখে। দেশটিতে চার্চগুলো রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী। তাদের কথা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব বহন করে। ফেব্রুয়ারিতেই আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল স্থগিত রাখে দক্ষিণ কোরিয়া।

কনফুসিয়ান তত্ত্বের সফলতা

কোরিয়ান আমেরিকান লেখক এস নাথান পার্ক গত বছর এপ্রিলে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর করোনা মোকাবিলায় সফলতার মূলে এখানকার সামাজিক কাঠামো ও জীবনযাত্রার একটি ভূমিকা আছে। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রাচীন চীনা মনিষী কনফুসিয়ানের প্রভাব। এ অঞ্চলের সমাজ জীবন অনেকটা একই ধরনের এবং ঐতিহ্য মেনে চলার প্রবণতা রয়েছে যা পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। পশ্চিমা রীতির একজন সমালোচক হিসাবেও নাথান পার্কের পরিচিতি রয়েছে। তিনি চীন, জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যকে করোনা মোকাবিলায় সাফল্যের একটি কারণ মনে করেন। ব্যক্তি বা নাগরিক স্বাধীনতার কারণে লকডাউন বা সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ ঐ দেশগুলোর সরকারের জন্য সহজ নয়।

ইত্তেফাক/এসআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x