আরব বসন্তের ১০ বছর

আরব বসন্তের ১০ বছর
ছবি: সংগৃহীত।

দশ পার করে এগার বছরে পা দিয়েছে আরব বসন্ত। আরব দেশগুলোর জনগণ এ থেকে কী পেল বিশ্বেই বা কতটুকু পরিবর্তন এসেছে সে নিয়ে একটি মূল্যায়ন করার সময় এসে গেছে। দীর্ঘদিনের একনায়ক শাসকদের হটিয়ে গণতন্তের পথে যাত্রা শুরু করা ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য শুরুতেই হোঁচট খায়।

মিসরে ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রতিবাদকারীরা মাঠে নামে। প্রতিবাদ ক্রমেই উত্তাল হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন। দেশটি ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের পথে হাঁটা শুরু করলেও দুই বছর পর ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতেই যায়। আরো কঠোরভাবে ফিরে আসে সেনাশাসন। যে তিউনিসিয়া থেকে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল সেখানে গণতন্ত্র খুব শক্ত ভিত গাড়তে পারেনি। অগ্রগতি যা হয়েছে তা সামান্যই। পার্শ্ববর্তী লিবিয়া গাদ্দাফিকে হটালেও দেশটি গৃহযুদ্ধ থেকে বের হতে পারেনি। একই অবস্থা ইয়েমেন ও সিরিয়াতেও।

অনেকে মনে করতে পারেন এটিই হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের চিরাচরিত রূপ। ভুলে গেলে চলবে না সেখানকার অনেক দেশ এক সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশ ছিল। ঔপনিবেশিকরা চলে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীনরা তাদের রেখে যাওয়া পুরোনো কাঠামো ও ধ্যান ধারণার ওপরই সরকার গঠন করে। জনগণের আশাআকঙ্খা তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। ঔপনিবেশক রাষ্ট্রকাঠামো কেবল পশ্চিমাদের স্বার্থই রক্ষা করেছে। অন্যদিকে জনগণের শক্তি কমেছে।

আরব শাসকরা যে তাদের জনগণের ওপর কর্তৃত্ববাদী আচরণ করে থাকে পশ্চিমারা সেটা স্বীকার করতে চায় না। বাস্তবতা হলো উত্তরাধিকার সূত্রে এই শাসকরা একটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা পেয়েছে যা তারা ভিন্ন নামে চালু রেখেছে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য সম্পদ সমাজের ওপরতলার মধ্যে সীমিত থাকা। এ কারণে সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়েছে কিন্তু সম্পদে তাদের মালিকানা বাড়েনি। সম্পদ বেড়েছে শুধুই ধনী ও শাসক শ্রেণি। তাদের বিত্ত বৈভব প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে যেমন পিছিয়েছে তেমনি রাজনৈতিক সংস্কার না হওয়ায় তারা মত প্রকাশের সুযোগ থেকেছে বঞ্চিত। যুগ যুগ ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত আরব বসন্তে গড়ায়।

ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মত বরাবরই উপেক্ষিত থাকে। এ ব্যবস্থায় শাসকদের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে। একটি হলো ধীরে হলেও সংস্কারের পথে হাঁটা। অপরটি বিদ্যমান কাঠামো অব্যহত রাখা। এ অবস্থায় অধিকাংশকে মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে ঔপনিবেশিক সময়ের মতো ক্ষুদ্র একটি অংশকে সুযোগ সুবিধার ভাগীদার করা। বেশিরভাগ শাসক দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে। এটি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার সহায়ক। তবে আখেরে শেষ রক্ষার নিশ্চয়তা এটি দেয় না।

আরব বসন্তের ১০ম বার্ষিকীর সময় এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে আন্দোলনের ভবিষ্যত্ কি? ভৌগলিকভাবে অঞ্চলটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কয়েকটি দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে। গৃহযুদ্ধগুলো এককভাবে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা যাবে না। কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আপাতদৃষ্টে আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে আছে। মিসরের অবশ্য এরই মধ্যে অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই দেশগুলো চাইছে আঞ্চলিক স্থিতবস্থা বজায় থাকুক। পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটি লক্ষ্য করা যায় না। একদিকে তারা ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থি গ্রুপ হামাসকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, অপরদিকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে।

এই দেশগুলো কখনোই চাইবে না মুসলিম ব্রাদারহুড ধাঁচের ইসলামপন্থি শক্তি ক্ষমতায় আসুক। সৌদি-মিসর ও আমিরাতের সমান্তরালে তুরস্ক ও কাতারের আরেকটি জোট সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। উভয় লক্ষ্য মোটামুটি একই আঞ্চলিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। কোনো একটি পক্ষ যে স্পষ্টত প্রাধান্য অর্জন করতে পেরেছে সেটি বলা যাবে না। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পরোক্ষভাবেও প্রভাব রেখে চলেছে ইরান। দূরত্ব সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্ক রয়েছে, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কাতার-তুরস্ক ব্লকের সঙ্গেও ইরানের সুসম্পর্ক আছে। আরব বসন্ত ইরানকে প্রভাব বলয় বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু সংকটের সমাধান না হলে দীর্ঘ মেয়াদে তা কারো জন্যই শুভ ফল বয়ে আনবে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x