২০ কোটি রুপিতে শুভেন্দুর দলবদল!

স্বপ্ন ছিল মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার
২০ কোটি রুপিতে শুভেন্দুর দলবদল!
শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত

নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আবারও পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির জন্য বড় আক্ষেপের বিষয় হলো—তিনি একটি মাত্র আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং পরাজিত হয়েছেন। নন্দীগ্রামে তিনি পরাজিত হয়েছেন তার সাবেক শিষ্য শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। যিনি কিছুদিন আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হন।

কিন্তু এই শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মমতা ব্যানার্জির ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন। ক্রমে তৃণমূল কংগ্রেসে হয়ে ওঠেন সেকেন্ড ম্যান। কিন্তু হঠাত্ করেই কেন তিনি মমতাকে ছেড়ে গেলেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন? জানা যায়, দলে প্রভাব বাড়তে থাকায় এক সময় শুভেন্দু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার। দলে মমতা ব্যানার্জির ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জির উত্থানকে মেনে নিতে পারেননি তিনি। এ কারণেই শুরু হয় কোন্দল। সেই কোন্দল দলত্যাগ পর্যন্ত গড়ায়। অন্তরে লালিত মুখ্যমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন থেকেই ২০২০ সালের নভেম্বরে তিনি যোগ দেন বিজেপিতে। মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ঘোষণা দেন মমতাকে তিনি ঐ কেন্দ্রে ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারাবেন।

তার আগে মমতা ব্যানার্জির পর তৃণমূল কংগ্রেসে সর্বোচ্চ ক্ষমতা উপভোগ করেছেন তিনি। ২০০৯ সালে নন্দীগ্রাম যে লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সেই তমলুক থেকে জেতেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ভোটে। ৫ বছর পর ব্যবধান বেড়ে হয় ২ লাখ ৪৬ হাজার।

২০১৬ সালে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসন থেকে ৮১ হাজারেরও বেশি ভোটে জিতে হন পশ্চিমবঙ্গের পরিবহন মন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান। তার বাবা শিশির অধিকারী তৃণমূলের এমপি ছিলেন কিছুদিন আগেও। এখন তিনি দল ত্যাগ করে বিজেপিতে গেছেন। শুভেন্দু অধিকারীর ভাই এখন তমলুক লোকসভা আসন থেকে জিতে তৃণমূলের এমপি রয়েছেন। আরেক ভাই সৌমেন্দু ছিলেন একটি পৌরসভার চেয়ারম্যান।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দুর ক্ষমতাও বাড়ে। কয়েকটি জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পান। হন তৃণমূল যুবার সভাপতি। পরবর্তী সময় এই পদে মমতা তার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জিকে দায়িত্ব দেওয়া থেকেই শীতল সংঘাতের সূত্রপাত।

তৃণমূল সূত্র জানায়, অভিষেককে মেনে নিতে পারেননি শুভেন্দু। তার সঙ্গে নানা ইস্যুতে মন কষাকষি হতো। এ নিয়ে মমতা নিজেও কয়েকবার দায়িত্ব নিয়ে বৈরিতা মেটানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তা ক্রমেই বেড়ে যায়। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় মমতা শুভেন্দুকে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং মুর্শিদাবাদ জেলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন। এর পরই শুভেন্দু আরো বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন।

শুভেন্দু ভেবেছিলেন ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি যদি অনুকূল হয় তাহলে মমতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেও হতে পারেন। সেক্ষেত্রে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হবেন। সেই ইচ্ছার কথা তিনি ঘনিষ্ঠ মহলেও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ক্রমেই তিনি বুঝতে পারেন মমতার ভাতিজার কাছে তিনি ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে শুভেন্দুর দায়িত্বে থাকা ৪ জেলায় ফল ভালো হয়নি। এ নিয়ে মমতা তাকে ভর্ত্সনা করেন। এর পরই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয় শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন।

এর পরই শুভেন্দু-মমতা সংঘাত শুরু হয়। ক্রমেই শুভেন্দু একের পর এক পদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক মহলের কানাঘুষার জন্য কয়েক কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর পরিমাণ ২০ কোটি রুপি হতে পারে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যদিও শুভেন্দু বা বিজেপির নেতারা কেউই তা মানতে চাননি।

শুভেন্দুর বিজেপিতে যোগদানের শর্তই ছিল ক্ষমতায় এলে তাকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে। দর কষাকষি হয়। বিজেপি চার জেলায় শুভেন্দুর নেতৃত্বের ক্যারিশমা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রফা হয় বিজেপি ক্ষমতায় এলে তিনি উপ-মুখ্যমন্ত্রী হবেন। পশ্চিমবঙ্গের জনতার রায়ে সেই ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল।

শুভেন্দু নন্দীগ্রামে জিতলেও মমতাকে ৫০ হাজার ভোটে হারানোর চ্যালেঞ্জ সফল হয়নি। তেমনই অপূর্ণ রয়ে গেল তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নও। ভোটের পর তিনি নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এমনকি জয়ের সার্টিফিকেটও নিজে নিতে যাননি। যে চার জেলার জন্য বিজেপি তাকে নিয়েছিল, সেখানেও তিনি সফল হননি। ঐ চার জেলায় বিজেপি ৫৫ আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র ১২টি আসন। এমনকি তার নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরেও ১৬ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে মাত্র সাত আসন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুভেন্দুর জন্য একরকম ‘?রাজনৈতিক আত্মহত্যা’। নিজে মমতাকে হারিয়ে নন্দীগ্রামে জিতলেন কিন্তু সেই আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না। কারণ বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি। গত সোমবার মমতা ব্যানার্জি দলত্যাগ করা নেতাদের ফেরার ডাক দিয়েছেন। মমতাকে প্রকাশ্য সভায় গালাগাল করায় শুভেন্দুর জন্য সেই পথও বন্ধ! ভোট ফলাফলের যা চিত্র তাতে তার বাবা শিশির অধিকারী বা ভাই দীব্যেন্দু যদি এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করে বিজেপির হয়ে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যান, তাহলে তাদের হারার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূলে ফিরবেন তারই বা পথ কোথায়?? শুভেন্দু এখন সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপির দলনেতা হতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি বিরোধী নেতার মর্যাদা পাবেন। বিজেপি কি তাকে সেই পদ দেবে?

ইত্তেফাক/টিএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x