ইউরোপের নতুন হতাশা

ইউরোপের নতুন হতাশা
ছবি: সংগৃহীত

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হঠাত্ বিদায় ইউরোপ কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তারা স্পষ্টতই হতাশ। কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করেছে। লক্ষণীয় যে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি আটলান্টিকের দুপারের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন পশ্চাদপসরণ কি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। এ ঘটনায় বহু মানুষ দেশান্তরী হয়েছে। শরণার্থীদের দুর্দশার বিষয়টি তো স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের মাশুল তারা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইউরোপীয়রা আপাতদৃষ্টে যে সমস্যা দেখছে লক্ষ করলে দেখা যাবে এই সমস্যা রয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যেই।

NATO, US-led coalitions suspend training of Iraqi forces in wake of  Soleimani killing | Daily Sabah

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে তাদের প্রধান উদ্বেগ হলো দূরত্ব তৈরির আশঙ্কা। ওয়াশিংটন কি তাহলে একা চলোর নীতি বেছে নিল। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা ইউরোপে এ ধারণা বদ্ধমূল করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নীতি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি তার প্রশাসনের ছিল। তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতা তার সময়ই হয়েছিল।

চলতি বছর গোড়ার দিকে বাইডেন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, ‘আমেরিকা ইজ কাম ব্যাক’, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার ফিরে এসেছে। তার এ কথায় ইউরোপ সংবিত্ ফিরে পায়। কারণ ট্রাম্পের সদ্য সমাপ্ত প্রেসিডেন্সি তখনো স্মৃতিতে জাগরূক। এরপর বাইডেন এ বিষয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে যেভাবে ফিরে এসেছে তাতে ইউরোপীয়রা এ প্রশ্ন তুলতেই পারে যে বলকান অঞ্চলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না।

EU foreign ministers to hold Afghan crisis talks – EURACTIV.com

আফগান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ আসলে শরণার্থীদের দুর্দশা নয়, বরং তারা এর মধ্যে নিজেদের নিরাপদ ভবিষ্যতের ওপর এক কালোছায়া দেখতে পাচ্ছে। বাস্তবতা হলো বৃহত্ শক্তি হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এখন পরিবর্তন ঘটেছে। দুর্বল হোক বা শক্তিশালী যে কোনো দেশেরই সম্পদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সীমিত সম্পদকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবহার না করে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

যেমন চীন ও রাশিয়া এখন তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। ইউরোপের মিত্র গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য এ দেশ দুটিকে বৈরী প্রতিপক্ষ বিবেচনা করা যায়। তাই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের অর্থ এ নয় যে, তাদের একেবারে ঘরে ফিরিয়ে এনে বসিয়ে রাখা হবে। এদের কৌশলগত যে কোনো স্থানে মোতায়েন করা হতে পারে।

মানবাধিকারকেই পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ করতে চান বাইডেন। ইতোমধ্যেই তিনি একথা জানিয়েছেন। এর জন্য প্রয়োজন কূটনীতি ও অর্থনীতির মতো মাধ্যমগুলো ব্যবহার করা, বারংবার সামরিক অভিযান চালানো নয়।

Afghanistan: German Government Admits Evacuating Only Seven People On First  Flight From Kabul - UNILAD

এছাড়া এক্ষেত্রে ইউরোপের মতো মিত্রদের পাশে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আফগানিস্তান ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সামাল দেয় তাতে তার ইউরোপীয় মিত্ররা হতাশ। এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে যথাযথ সমম্বয় করা হয়নি বলেই ইউরোপ মনে করে। বিশ্লেষকদের মতে এই সমালোচনা অমূলক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যারাই ক্ষমতাই থাকুক ইউরোপীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে একটা দূরত্ব বা ভুল বোঝাবুঝি অনেক দিন ধরেই রয়েছে।

১৯৯০-এর দশক থেকে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এটি আটলান্টিকের দু পারের বোঝাপড়া হয়তো বাড়িয়েছে কিন্তু ইউরোপের খুব একটা সুবিধা হয়নি। ইরাক থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপের কসোভোয় হয়েছে এসব যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ইউরোপকে নিতে হয়েছে শরণার্থীর বোঝা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি ইউরোপকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষে বাস্তবতা ইউরোপকে শরণার্থীদের গ্রহণ করতে বাধ্য করে। সর্বশেষ আফগান পরিস্থিতি ইউরোপকে হতাশ করলেও এতে আশাবাদী হওয়ারও সুযোগ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

Most EU forces exiting Afghanistan after 20 years

কারণ এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা উদারনৈতিক মূল্যবোধ ফিরে আসার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমা দেশগুলো জটিল সময় পার করছে। যেমন বলা যায় অর্থনৈতিক সংকট, দীর্ঘ সামরিক অভিযান, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের সমস্যা এবং জাতীয়তাবাদী পপুলিজমের উত্থানের কথা। এর সঙ্গে আনা যায় চীন ও রাশিয়ার উত্থানের বিষয়টি। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, পশ্চিমাদের জন্য আদর্শিক চ্যালেঞ্জও বটে। গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব দিন দিন প্রকট হয়েছে।

পশ্চিমা মূল্যবোধ ফিরে আসার পটভূমি মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। শক্তি প্রয়োগ করে একনায়কদের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিন বদলেছে। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে এর জোরালো প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তার পরও কথা থাকে, সামরিক উপায় ছাড়া অর্থনৈতিক, মানবিক ও কূটনৈতিক পন্থায় পশ্চিমা মূল্যবোধ সম্প্রসারণ কি আসলেই সম্ভব। জার্জিয়া ও ইউক্রেনে এই নীতি কিছুটা কাজে এসেছে।

Britain Confirms Most UK Troops Have Left Afghanistan | Voice of America -  English

কিন্তু ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো মার্কিন নীতি বেলারুশ, সার্বিয়া ও তুরস্কের ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছে। তাহলে সমাধান কোন পথে? বর্তমান বহু মেরু বিশ্বে ইউরোপকেও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। বের করতে হবে বাস্তবতা ও মূল্যবোধের সমম্বয়ে নতুন কোনো উপায়।

ইত্তেফাক/টিআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x