সময়মতো ছানি অপারেশন করে স্বাভাবিক দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৫

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৭ লাখ ৫০ হাজারহান্নান মানুষ অন্ধ। যাদের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থাত্ (৬ লাখ ৫০ হাজার) ছানিজনিত কারণে অন্ধত্বের শিকার। প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। দেশে প্রায় ৪০ হাজার শিশু অন্ধ, যার প্রায় ১২ হাজারই ছানিজনিত কারণে। সময়মতো ছানি অপারেশন করে কৃত্তিম লেন্স সংযোজনের মাধ্যমে স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অন্ধত্বের প্রধান কারণগুলো হলো—ছানিজনিত, দৃষ্টি স্বল্পতা, শিশুদের অন্ধত্ব, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, গ্লুকোমা, আঘাত জনিত, বয়স জনিত কারণে রেটিনার সমস্যা।

বিশ্বে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অন্ধ। ২১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ মধ্যম ও অতিমাত্রার ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন অর্থাত্ (দূরের জিনিস কম দেখা)। ১০০ কোটি মানুষ কাছের অর্থাত্ স্বল্প দৃষ্টি সম্পন্ন। ৮৯ শতাংশ মানুষ মধ্যম এবং স্বল্প আয়ের দেশের।

কচুয়া থানার মাদ্রাসা ছাত্রী নার্গিস বেগম। ছোটোবেলা থেকে তার ডান চোখে কর্ণিয়াতে সাদা দাগ দেখা দেয়, কিন্তু গ্রামের মানুষ সেটাকে চোখে ফুল পড়া বা সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়। সেই দাগ বাড়তে বাড়তে এক সময় পুরো কর্ণিয়া দখল করে নেয় এবং নার্গিস বেগম চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন। চল্লিশোর্ধ্ব সাত্তার মিয়া দারোয়ান। চোখে কম দেখা, ঝাপসা দেখা সমস্যার এক পর্যায়ে তিনি অন্ধ হয়ে যান। বাসায় বসে তার দিন কাটে। কোনো এক শুভক্ষণে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হলে চিকিত্সক জানান তার চোখে ছানি পড়েছে। পরে আই ক্যাম্পের মাধ্যমে ছানি অপারেশন করে এখন তিনি আবারও কর্মক্ষম হয়েছেন।

গবেষণায়ও দেখা গেছে; দৃষ্টিহীন মানুষের ৮০ শতাংশ গ্রামে বাস করে। যাদের ৯০ ভাগ দরিদ্র। যাদের চিকিত্সা নেওয়ার সাধ্য নেই। ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব নির্মূলের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে ন্যাশনাল আই কেয়ার। ন্যাশনাল আই কেয়ারের সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ করছে ইনগো ফোরাম (সাইটসের্ভাস, অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, দি ফ্রেড হলোজ ফাউন্ডেশন, হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, সিবিএম, ব্র্যাক, হার্ট টু হার্ট ফাউন্ডেশন, আন্দেরী হেলফি) ও দেশি-বিদেশি চক্ষু চিকিত্সক প্রতিষ্ঠান।

 দেশে মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ শিশু। প্রায় ১৫ লাখ শিশু দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছে, যা চিকিত্সার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব নির্মূলের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল আই কেয়ার তার কাজের গুরুত্ব নির্ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে—দক্ষিণবঙ্গের গোপালগঞ্জ জেলাসহ ৮টি জেলার ২০ উপজেলা, উত্তরবঙ্গের রাজশাহী এবং রংপুর জেলাসহ ১০ জেলার ৩০ উপজেলার মোট ৫০টি কমিউনিটি ভিশন সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে ১ কোটি ১২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৬ জন প্রান্তিক মানুষকে সমন্বিত উন্নত চক্ষু চিকিত্সা সেবার আওতায় আনা হয়েছে। গত এক বছরে প্রায় দেড় লাখ চক্ষু রোগীকে সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চক্ষু চিকিত্সা সেবা প্রদান করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক জাহিদ মালেক বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষকে চক্ষু সেবার আওতায় আনতে প্রত্যেকটি উপজেলায় ‘কমিউনিটি ভিশন সেন্টার’ স্থাপন করা হবে। ন্যাশনাল আই কেয়ারের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৫০টি কমিউনিটি ভিশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। যার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষরাও চিকিত্সা সেবা পাচ্ছে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এবং ন্যাশনাল আই কেয়ারের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, চোখের ছানিজনিত অন্ধত্ব দূরীকরণে প্রতিটি জেলায় চক্ষু বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনগণের মধ্যে চক্ষু রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ন্যাশনাল আই কেয়ার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আলাদা একটি অপারেশনাল প্ল্যান এবং এর জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ আছে। ন্যাশনাল আই কেয়ারের সকল কার্যক্রম জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে পরিচালিত হয়।