জলবায়ুর পরিবর্তন একটি নিরন্তর বিষয়। পরিবর্তনই প্রকৃতির ধর্ম। কেবল জলবায়ু নহে, প্রতি মুহূর্তেই জগতের সকলকিছুই কমবেশি পরিবর্তিত হইতেছে। সুতরাং জলবায়ুরও পরিবর্তন ঘটিবে, ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই; কিন্তু সেই পরিবর্তনের বড়ো কারণ যদি হয় মানুষের কর্মকাণ্ড, তবে উহার লাগামটাও টানিয়া ধরা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসাবে বলা হয় গ্রিনহাউস গ্যাসকে। আর এই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয় শক্তির উত্পাদন এবং উহার ব্যয়ের মাধ্যমে। এবং কত বিচিত্র ধরনের কর্মকাণ্ডে এই গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ ঘটে—তাহা আমজনতার ধারণারও বাহিরে। যেমন ধরা যাক, স্মার্টফোনের মাধ্যমে জনপ্রিয় ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপসে বিভিন্ন জনপ্রিয় সিনেমা বা ওয়েবসিরিজ দেখিবার বিষয়টি। জানা গিয়াছে, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজনে বিভিন্ন সিনেমা বা ভিডিও সিরিজ দেখিবার মধ্যেও নাকি বাড়িতেছে পরিবেশ দূষণ? আপাতভাবে আজগুবি শোনাইলেও গবেষণায় জানা গিয়াছে, কেহ যদি আধঘণ্টা নেটফ্লিক্সের স্ট্রিমিং দেখেন, তাহা পরিবেশে ১ দশমিক ৬ কিলোগ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড ছড়ানোর সমপরিমাণ দূষণ সৃষ্টি করিয়া থাকে—যাহাতে রহিয়াছে ৬ দশমিক ২৮ কিলোমিটার গাড়ি চালানোর সমতুল্য কার্বন।
গবেষকরা জানাইয়াছেন, ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের সময় ভালো ছবির মানোন্নয়নে প্রতি ইঞ্চিতে বেশি পরিমাণ পিক্সেল দেওয়া হাই-ডেফিনিশন ছবি তৈরি করিতে অনেক বড়ো ডিজিটাল ফাইল তৈরি করিতে হয় পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে। এবং সেই বড়ো ফাইলকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বত্সরভর নিরবচ্ছিন্ন স্ট্রিমিং বজায় রাখিয়া গ্রাহকসেবা দিতে আরো বেশি করিয়া বিদ্যুত্ খরচ করিতে বাধ্য হয় ডাটা সেন্টারগুলিকে। যাহার জের ধরিয়া বাতাসে নির্গত হয় অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড। সমীক্ষায় জানা যায়, ২০১৮ সালে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের দরুন যে পরিমাণ দূষণ বাতাসে ছড়াইয়াছে, গোটা স্পেনে সামগ্রিক ভাবে বত্সরে তত পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড উত্পন্ন হইয়াছে। ফোরজি হইতে বিশ্বব্যাপী ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িতেছে ফাইভজি নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে জনপ্রিয়তা বাড়িতেছে নেটফ্লিক্স-অ্যামাজন প্রাইমের মতো অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফরম। কার্বনের নিঃসারণ এমন একটি বিষয়, যেই দেশ হইতেই উহা বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হউক না কেন, উহা ছড়াইয়া পড়ে পৃথিবী জুড়িয়া। অর্থাত্ ভুক্তভোগী হয় পৃথিবীর সমস্ত মানুষ। সুতরাং আগামী দিনে দূষণের মাত্রা যে বহুগুণ বাড়িবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। সিসকো নেটওয়ার্ক তাহাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় জানাইয়াছে, ২০১৭ হইতে ২০২২ সালের মধ্যে ইন্টারনেট ভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং-এর পরিমাণ চারগুণ বৃদ্ধি পাইবে এবং ২০২২ সালে পৃথিবীর সামগ্রিক ইন্টারনেট ট্রাফিকে ৮০ শতাংশ ডাটাই ব্যবহূত হইবে এই কাজে। গত বত্সর নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয়তা ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। তাহা ছাড়া বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় রহিয়াছে ডিজনি এবং অ্যাপলের মতো ভিডিও স্ট্রিমিং সংস্থা। সুতরাং পরবর্তী পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়।
প্রশ্ন হইল, তাহা হইলে করণীয় কী? বাংলাদেশেও এইসকল সংস্থার ভিডিও স্ট্রিমিং হাঁটিহাঁটি পা পা করিয়া জ্যামিতিক হারে জনপ্রিয় হইতেছে। এখন যথাসম্ভব কম শক্তি খরচ করিয়া যদি উন্নতমানের ভিডিও স্ট্রিমিং গ্রাহককে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহা হইলে এই দূষণের লাগাম কিছুটা টানা সম্ভব হইতে পারে।
