আমাদের রাবার শিল্পের হালচাল

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৪৫

আবুল কাসেম ভূঁইয়া

আমাদের দেশের রাবার শিল্প ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯১০ সালের কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে রাবার গাছের চারা এনে চট্টগ্রামে বারমাসিয়া ও সিলেটের আমুচা চা বাগানে লাগানো হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৫৪ সালের দিকে বন বিভাগ টাঙ্গাইলের মধুপুর চট্টগ্রামের হাজারীখীল ও তেঁতুলিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে কিছু রাবার চারা রোপণ করা হয়। এভাবে আমাদের দেশে রাবার চাষের গোড়াপত্তন ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের দিকে বাংলাদেশে রাবারের বাণিজ্যিক চাষে সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিশেষজ্ঞ মিঃ ইউলিয়াম লয়েডকে দায়িত্ব দিলে তিনি তার সমীক্ষায় এদেশের জলবায়ু ও পাহাড়ি এলাকার মাটি বাণিজ্যিক রাবার চাষের উপযোগী বলে এর চাষের অনুকূলে রিপোর্ট দেন। তার সুপারিশের ভিত্তিতে বন বিভাগ ১৯৬০ সালে ৭১০ একরের একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজারের রামু, আর চট্টগ্রামের রাউজানে যথাক্রমে ৩০ এবং ১০ একর বাজার সৃজনের মাধ্যমে এদেশের বাণিজ্যিক রাবার চাষ শুরু করেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রাবার চাষ হচ্ছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের রামু, রাউজান, ডাবুয়া, হলুদিয়া, কাঞ্চননগর, তারাখো, দাঁতমারা, সিলেটের ভাটেরা, সাতগাঁও, রূপাইছড়া, শাহাজী বাজার, ময়মনসিংহের মধুপুর, শেরপুর, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকা। সারা দেশে ১ হাজার ৩০৬টি বেসরকারি রাবার বাগান রয়েছে। সারা দেশে ৩২ হাজার ৬২৫ একর জমিতে রাবার চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ২৪ হাজার মেট্রিক টন রাবার উত্পন্ন হচ্ছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৬০০ কোটি টাকা। ২০১২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে রাবারের চাহিদা ৩% হারে বেড়েই চলেছে। যার চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দাঁড়িয়াছে ৭%। বর্তমানে রাবার দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ধরনের দ্রব্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। রাবার দিয়ে প্রধানত গাড়ির চাকার টায়ার, টিউব, জুতার সোল, সেন্ডেল, ফোম রেক্সিন, হোসপাইপ, গাম, খেলনা, শিল্পকারখানার দ্রব্যসামগ্রী চিকিত্সা শাস্ত্রের বিভিন্ন সামগ্রীসহ গৃহস্থালী কাজের ব্যবহূত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ রাবার চাষে নবীন হলেও এর ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, পরিবেশ সহায়ক ও আর্থসামাজিক প্রয়োজনে রাবার চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্রুত বনায়ন, বনায়নের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ এলাকার ভূমিক্ষয় রোধ, বিপুল কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয়ের ব্যবস্থাসহ প্রভূত কল্যাণ সাধন হবে এদেশের রাবার চাষের মাধ্যমে।

বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ রাবার উত্পন্ন হচ্ছে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে রাবার বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। একটি পরিসংখ্যনে দেখা গেছে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বিদেশে রাবার রপ্তানি করে ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি টাকা আয় করেছে। বর্তমানে দেশের রাবার শিল্পের স্বার্থে বিদেশ থেকে রাবার আমদানি বন্ধ করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। রাবার বাগান মালিকরা রাবার উত্পাদনে সফলতা আনতে রাবার চাষিদের স্বার্থ সংরক্ষণ উত্পাদিত রাবারের মান উন্নয়ন, বিপণন, ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা এবং রাবারের আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশীয় রাবারের বাজার মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার স্বার্থে জাতীয় রাবার নীতি ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। রাবার শিল্পের উন্নয়নে রাবার গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন।

বর্তমানে সারা বাংলাদেশে লক্ষাধিক একর জমিতে রাবার চাষ হচ্ছে। বিশ্ববাজারে রাবারের দরপতন, অবাধ আমদানি আর দেশীয় বাজারে রাবার বিক্রিতে অস্বাভাবিক কর আরোপ (সর্বমোট ২৫%) রাবার খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০১০ সালের ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রিত রাবার বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি করে উত্পাদন খরচের অর্ধেকও পাওয়া যায় না। প্রান্তিক চাষিদেরকে এরকম ক্ষতি করে একে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ফলে দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত চিরতরে ধ্বংস হয়ে দেশ অচিরেই সম্পূর্ণভাবে রাবার আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে এবং অপরদিকে এর ওপর নির্ভরশীল সবাই তাদের রুটি রুজির সুযোগ হারাবে। দেশের রাবার শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে বাংলাদেশ রাবার বাগান সমিতি কিছু দাবি সরকারের কাছে পেশ করছে।  রাবার রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত কর্তৃক আরোপিত বিদ্যমান সমস্যা সমাধানসহ রাবার রপ্তানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২০% ইনসেনটিভ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। বিদেশ থেকে রাবার আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক। সমন্বিত রাবার চাষ প্রকল্পের উন্নয়নের জন্য ভারতের ন্যায় ০% / ৩% সুদে দীর্ঘমেয়াদি রাবার ঋণ ও বীমা সুবিধা দেওয়া হোক।

শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং থাইল্যান্ডের মতো রাবার চাষিদেরকে ভর্তুকী দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। রাবার চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও মালিকদেরকে দেশে এবং বিদেশে (যেমন: মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত) প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। রাবার চাষের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশ থেকে উন্নতজাতের ক্লোন সংগ্রহ, বিদেশি রাবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, রাবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কোনো তদন্ত ছাড়া একতরফাভাবে বাতিলকৃত প্লটসমূহ রাবার বোর্ডের আওতায় আনা হোক। রাবার বাগান এলাকার সব বাগানে সরকারি খরচে টিউবওয়েল স্থাপন করতে হবে। রাবার চাষিদেরকে স্বল্পমূল্যে সার বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের রাবার শিল্প প্রকৃত শিল্পে বাস্তবায়িত হলে এদেশের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা এব্যাপারে একটু সুনজর দেবেন বলে বাংলাদেশ রাবার বাগান মালিক সমিতি আশা করে।

n লেখক : বীমা কর্মকর্তা