মুক্তা আক্তার
প্রচার-প্রচারণা মূলত সমাজ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার পাশাপাশি খবরা-খবরের ধারাবাহিকতা প্রকাশের কাজে ব্যবহূত হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে এ প্রচারণার ভালো দিকগুলোর পাশাপাশি রয়েছে ভয়াবহ কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক যা মহামারি আকার ধারণের মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিজেদের অসতর্কতা ও হেঁয়ালিরবশে একটু একটু করে ক্ষয় করছে মানবিকতা। পত্রপত্রিকা, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমেও আমরা প্রতিনিয়ত নানান খবর পড়ে ও দেখে থাকি। আপাতদৃষ্টিতে জনগণের কাছে সত্য ও সঠিক সংবাদটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মাধ্যমগুলো বিভিন্নভাবে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিক চিত্র সংযুক্ত করে থাকে। উদ্দেশ্য, সচেতনতা বৃদ্ধি ও সঠিক প্রচারণা হলে একই সঙ্গে কিছু ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঘটনাসমূহের এ অতি ব্যাখ্যা সম্বলিত প্রচারণা থেকে সচেতনতার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মনে ভীতি, মানুষিক চাপ, অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধিসহ শুরু হয় নীরব গৃহযুদ্ধ।
বিষয়টি অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার সাহায্যে সহজ করা যেতে পারে। কিছুদিন আগে রটে যাওয়া ছেলেধরা গুজবের সঠিক সূত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি কিন্তু শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে এ গুজবের দরুন চলে গেছে কিছু সাধারণ মানুষের প্রাণ। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের মনে নিজ সন্তানকে নিয়ে বেরোবার আগে ভাবতে হচ্ছে হাজারবার। বাচ্চাদের মনে বাইরের জগত্ সম্পর্কে যে ভয় ও সন্দেহের জন্ম হচ্ছে তা ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে তার সাধারণ জীবনের প্রতি। ধর্ষণ সম্পর্কিত ঘটনাগুলো সামাজিক অবক্ষয়ের এক নিদারুণ ফলাফল যা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ধ্বংস করে চলেছে অসংখ্য নারী ও তার পরিবার। এ মারাত্মক অপরাধের যে ভয়াবহ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে নেই তত্পরতা। অথচ ফলাও করে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর প্রচারণা ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটি কিংবা সমগ্র পরিবারটিকে সামাজিকভাবে হেয় করে তুলে ঠেলে দেয় এক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন-ব্যবস্থার দিকে, যেখানে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার হরণই নয়, কখনো মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে দিতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে সমাজে বসবাসরত মানুষরূপী জানোয়ারগুলো অপরাধের নতুন মাত্রা খুঁজে পায়, তারা অপরাধের অভিনব পদ্ধতি বের করতে ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়, অপরাধের পর তা নিয়ে অনুশোচনা নয় বরং অতি উত্সাহে অপরাধ পুনঃপরিকল্পনায় লিপ্ত হয়। দিনেদিনে এ সকল অপরাধীর কার্যক্রম ভয়ংকর হতে থাকে কেননা তারা জানে অপরাধ যত গুরুতর এবং যত সংখ্যক হোক না কেন বিচার ব্যবস্থার আওতায় তারা সহজে ধরা পড়বে না। পুরোনো অপরাধীর পাশাপাশি জন্ম নেয় নতুন অপরাধী যারা হয়তো এ সকল অতিপ্রচারের মাধ্যমেই নতুন করে অপরাধ জগতে পদার্পণ করছে। আর এভাবে অপপ্রচার সামাজিক ভীতি তৈরির পাশাপাশি নতুন করে প্রতিদিন অপরাধীদের মনে প্রণোদনা যোগাচ্ছে।
ভিন্ন মতাদর্শ থাকা যেমন অপরাধ নয়, তেমনি কোনো দলীয় ক্ষমতাকে সর্বশক্তির আধার চিন্তা করা, সেই চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে হতাহতসহ বিভিন্ন অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা শুধু সংকীর্ণতার পরিচয়ই নয় বরং এ এক কুপ্রবৃত্তিও বটে। এ রকম শতশত বিষয়ে প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত খবরগুলো ফলাও করে জনসম্মুখে আসার দরুন সমাজে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে। সর্বোপরি প্রচারের পরিবর্তে অপপ্রচার রোধ করা এ সময়ের জরুরি কার্যক্রম হওয়া উচিত যা সমাজে ভীতি দূরীকরণের পাশাপাশি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে রাতারাতি পালটে দিতে পারে সামাজিক চিত্র। অপপ্রচার রোধ, প্রচারণার বিষয়বস্তু নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন, যথাযথ ঘটনা জনসম্মুখে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সাবধানতার পাশাপাশি চিত্র ব্যবহারে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে এ বিষয়ক নীতিমালা থাকা জরুরি বলে আমরা মনে করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
