আজও শিউরে উঠি ঐ রাতকে ভেবে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৪৬

মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় র্যাগিং বিতর্ক যেন আমাদের অতি পরিচিত একটি বিষয়। বিশেষ করে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত, তাদের জন্য এ যেন এক অতীব পরিচিত টার্ম। আবরার হত্যার পর থেকে অবশ্য এখন দেশবাসীর জন্যও এক আতঙ্কের বিষয় এটি।

আমার জীবনে প্রথমবার শুনেছিলাম আমার এক বাল্যবন্ধুর  কাছ থেকে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকে যদিও যে যার মতো নিজেদের তাগিদে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি পরীক্ষার জন্য যাই। দুজনে একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেও প্রথমবারই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আমি ভর্তির সুযোগ পাই। আমার বন্ধু অন্য কোথাও না হওয়াতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পরের বছর (২০১৬ সাল) দ্বিতীয়বারের সুযোগ চালু থাকায় (ঢাবি ছাড়া), সে আবারও চবি এবং আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার প্রবল ইচ্ছা থেকে সে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যায়। কিন্তু ওইদিনই পড়ে যায় র্যাগিং খপ্পরে। ওই ক্যাম্পাসেরই কিছু বড়ো ভাই (বড়ো বোনও ছিল) মিলে তাকে র্যাগ দেয়। প্রথমে তাকে সিগারেট খেতে বলে তাদের সামনে তাও পরিপক্বতার সঙ্গে। পরে তাকে অনেক অশ্লীল কথাবার্তা বলে। একপর্যায়ে তাকে প্রেম করে কি না জিজ্ঞেস করে; না উত্তর পাওয়াতে তাকে শারীরিক অক্ষমতার অপবাদ দিয়ে উপহাস করে। সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার হলো, দেশি-বিদেশি সব নীল পর্দার তারকাদের খবর র্যাংকিংসহ বলতে বলে। যখন সে জানে না বলল, তখন দিল থাপ্পড়। শেষমেশ থাপ্পড়ের বাইরে তেমন কোনো শারীরিক নির্যাতন না পেয়ে রক্ষা পেয়েছিল সেদিন। বাকিটা আর না বলি। আর তার মুখ থেকে শোনা সেই বর্ণনা থেকেই র্যাগিং শব্দের সঙ্গে পরিচিত হই আমি। বুঝতামও শুধু এইটুকু। এইতো গেল সে সময়ের (২০১৬) কথা।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক হলাম যখন দেখলাম বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আমারই সবুজ ক্যাম্পাসে (চবি) এমন ঘটনার শিকার হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা একজন শিক্ষার্থী। কেন জানি খবরটা পড়ে আঁতকে উঠলাম। মনে পড়ে গেল সেই ভর্তিযুদ্ধের রাতটির কথা।

সময়টা শীতকাল, ২০১৫ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে। বিকালবেলা পরীক্ষা দিয়ে ৫টায় চবি ক্যাম্পাস থেকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সর্ব দক্ষিণে দোহাজারী (বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বশেষ পৌরসভা) গিয়ে সকালে পরীক্ষা দিতে আসা কতটা নাজুক পরিস্থিতি। অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলাম বলে শহরেও তেমন কাউকে বলা হয়নি। তাছাড়া ওটাই প্রথম গ্রাম থেকে এত দূরে কোথাও আসা। অবশেষে আর কিছু ভাববার সময় নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম রাতে চবির সেন্ট্রাল মসজিদে থেকে যাব। যেই কথা সেই কাজ। আমার মতো পরীক্ষার্থীও ছিল অনেক। তবে তারা সবাই চট্টগ্রামের বাইরে। আমার মতো এলাকার হতভাগা কেউ ছিল না। তাদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে সকালে পরীক্ষা দিতে চলে গেলাম। ও হ্যাঁ, তারা ছিল তাবলিক জামাতের। পরে রেজাল্ট পেলাম সি২-তে ৪৪ তম, বি১-এ ১৩৬তম। আর এখন আমি চবির ইংরেজি বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

এসব বলার একটাই কারণ ঠিক ওই পরিস্থিতিতে আমি যদি র্যাগ নামের ঘৃণিত ও এমন জঘন্য ঘটনার সাক্ষী হতাম তাহলে কেমন হতো ওই রাত! ভাবতেই শিউরে উঠি। ঠিক এভাবেই, এর চেয়ে আরো অনেক করুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই হয়তো হাজারো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর গল্প লুকিয়ে আছে প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আপন পাড়ায়। তাহলে কেন র্যাগিং নামের এমন পৈশাচিক কাজে আমাদের বিবেক বাধা দেয় না?

সবচেয়ে অবাক হলাম চবির ২৬ তারিখের সংবাদ শোনে। কারণ, যারা র্যাগ দিয়েছে তারা অত বড়ো কেউ না। ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। ভাবছি তারা এতটা দুঃসাহস করে কীভাবে—একটা বছর পার না হতেই?

পরিশেষে, আর কোনো শিক্ষার্থী যেন এমন নাজুক অবস্থার শিকার না হয়, সেই প্রত্যাশা রাখি। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জোরালো ভূমিকার দাবি জানাই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়