শাহ্জাহান কিবরিয়া
‘ভীতু বাঙালি’ এবং ‘ঘরমুখো বাঙালি’ বলে একসময় বাঙালি জাতির দুর্নাম ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,/রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।’ পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গর্বভরে বলেছিলেন, ‘কবিগুরু তোমার কথা মিথ্যা হয়ে গেছে, বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি যে শৌর্য-বীর্যের পরিচয় দিয়েছে তা এক কথায় অতুলনীয়। শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বাঙালি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও একাধিকবার এভারেস্ট জয় করেছে। খেলাধুলা এবং লেখাপড়ায়ও বাংলার ছেলেমেয়েরা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিচ্ছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যোগ দিয়ে বাঙালি সৈনিকরা বীরত্বের পরিচয় দিচ্ছে। বিদেশিদের আইন সভার সদস্য হচ্ছে।
বাঙালি এখন আর ঘরমুখো নয়। হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকে না। জীবিকার অন্বেষণে বাড়িঘর, জায়গা-জমি বিক্রি করে, টাকা-পয়সা ধার করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও অধিক উপার্জনের আশায় বিদেশে যাচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে তাদের অনেকে প্রতারিত হচ্ছে। সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারাচ্ছে। তবু বাঙালির বিদেশযাত্রা থেমে থাকেনি। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে তারা তাদের বিদেশযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। অর্থ-উপার্জন করে দেশে স্বজনদের জন্য টাকা পাঠাচ্ছে। অনেকে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসও করছে। বাঙালি এখন আর ‘ভীতু’ নয়, ‘ঘরমুখোও’ নয়। তবে বাঙালি মানুষ হয়েছে কি না সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। অর্থ, বিত্ত আর বীরত্ব দিয়ে মনুষ্যত্বের মূল্যায়ন করা যায় না। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে মানুষের স্থান অনেক ওপরে—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
বাঙালি মানুষ হলে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ আজ সন্ত্রাস, ঘুষ আর দুর্নীতিতে ভরে যেত না। দেশের মানুষকে অভুক্ত রেখে বাঙালি অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচার করত না। বাঙালি মানুষ হলে ঋণখেলাপিতে দেশ ভরে যেত না। বাঙালি মানুষ হলে দেশে নারী শিশু নির্যাতন মারাত্মক আকার ধারণ করত না, বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশে চালু থাকত না। বাঙালি মানুষ হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজিতে লেখা হতো না।
কবিগুরু, বাঙালি কবে মানুষ হবে?
ঢাকা
