ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিনের বাজার সীমিত হলেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা মন্দ নয়—বলছেন গবেষকেরা। ঢাকার ঐতিহ্যের কথা এলেই মসলিন কাপড়ের নাম সবার আগে আসে। এখন থেকে ৪০০-৫০০ বছর আগে ঢাকাই মসলিনের কদর ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মসলিনের প্রসঙ্গ উঠলে এর সঙ্গে অনেক গল্পও সামনে আসে। জনশ্রুতি আছে, একটি মসলিন শাড়িকে দেশলাইয়ের বাক্সে রাখা সম্ভব। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
দেশলাইয়ের বাক্সে রাখা সম্ভব না হলেও, মসলিনের কাপড়ের সূক্ষ্মতা এবং হালকা আরামদায়ক ভাব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এই মসলিন বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ৩০০ বছর আগে। বিলুপ্ত এই মসলিনকে আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ১৩ জেলায় নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে মসলিনের সুতা ও কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে মসলিনের সুতা ও কাপড় তৈরি করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলেছে, ‘বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনার আলোকে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। এর আওতায় ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, রাজশাহী ও যশোর—এই ১৩ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গবেষণামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মসলিনের সুতা ও কাপড় তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্য মসলিনের হারানো গৌরব ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর মসলিন নিয়ে কত দূর কী করা যাবে, সেই চিত্র উঠে আসবে।
তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘একসময় এ দেশের তাঁতিরাই মসলিনের সুতা ও কাপড় বুনতেন। এটি ছিল তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তি হারিয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সেই প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরপর থেকে আমরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন সূত্র থেকে সুতার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রাজশাহীতে তুলাগাছ লাগানো হয়েছে, সেটির ফলাফল কী আসে, তা দেখার অপেক্ষায় আমরা। এছাড়া কুমিল্লার চান্দিনায় তাঁত বোর্ড থেকে খদ্দরের চাদর বোনেন এমন ছয় জন কারিগরকে কাজে লাগানো হয়েছে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় মাসব্যাপী মসলিন উত্সবের আয়োজন করা হয়েছিল। দৃক গ্যালারি, আড়ং এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হয়েছিল এই উত্সব। এই মেলার উদ্দেশ্য ছিল নতুন করে মসলিনের সঙ্গে সবার পরিচয় করানো। এই মেলায় মসলিনের শাড়ি, পাঞ্জাবি আনা হয়েছিল। সেগুলোর সঙ্গে সবার পরিচয় করানো হয়।
মসলিন নিয়ে গবেষণা করছেন দৃক গ্যালারির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তো রোজ মোটা চালের ভাত খাই। তাই বলে আমরা তো বাসমতি ফেলে দিইনি। সে হিসাবে স্পেশাল জিনিস ফেলে দেওয়া উচিত নয়। মসলিন শুধু একটি কাপড় নয়, এটিকে দেখতে হবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে।
মসলিনের দাপট একসময় ইউরোপের বাজারে থাকলেও ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের পরে মসলিন আর টিকে থাকতে পারেনি। কারণ ইউরোপ জুড়ে তখন বস্ত্রশিল্প প্রসার লাভ করায় মসলিন বাজার হারিয়েছিল। তাছাড়া যে তুলা থেকে মসলিনের সুতা উত্পাদন হতো, সেই তুলার বীজও এখন আর পাওয়া যায় না। মসলিনের কারিগর রফিকুল ইসলাম বলছিলেন, আগের মসলিন উত্পাদন পুরোপুরি সম্ভব না হলেও কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব।
মসলিনের একটা বিশেষ বাজার রয়েছে বলে মনে করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, মসলিন কাপড় এখনো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়। ভারত খাদি মসলিন হিসেবে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে। কিন্তু এগুলোকে সব বলা হয় বেঙ্গল মসলিন। তাহলে নিশ্চয়ই এখনো মসলিনের একটা বাজার আছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে যখন দেশে-বিদেশে কাপড়ের হাজারো বৈচিত্র্য আছে, সেখানে মসলিন কতটা প্রাসঙ্গিক? গবেষক সাইফুল ইসলাম মনে করেন, সীমিত হলেও বাজার একেবারে মন্দা নয়। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ভারতের একটি গ্রাম মসলিনের নামে বছরে অন্তত ২৫ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মসলিন বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা, গ্রিক পর্যটক পিনটনি, টেইলর, ড. উরেসহ অনেকেই তাদের লেখায় বাংলার সুতি বস্ত্র মসলিনের বর্ণনা দিয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের সুতি বস্ত্রের মধ্যে ঢাকাই মসলিনের সুখ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। প্রাচীনকালে মসলিন প্রস্তুতি শুরু হলেও ঢাকাই মসলিন প্রসিদ্ধি লাভ করে মোগল আমলে। ঐ সময় পণ্যটি দেশ-বিদেশে প্রায় একচেটিয়া বাজার দখল করে। ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত জেমস টেলরের ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ গ্রন্থেও ঢাকাই মসলিন রপ্তানির বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সতেরো শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজরা মসলিনের ব্যবসায় যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ওলন্দাজ ও ফরাসি ব্যবসায়ীরা ঢাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে মসলিন রপ্তানি শুরু করে। ইংরেজ কোম্পানি আমলে মসলিনশিল্পের অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে দেশের গর্ব এই ঐতিহ্যবাহী মসলিন বিলুপ্ত হয়ে যায়।
