পরিবেশ তথা মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু হচ্ছে মেডিক্যাল বা হাসপাতালের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এ কারণে ২০০৮ সালে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য শহরে মেডিক্যাল বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হাসপাতাল বর্জ্য বিধিমালা তৈরি করে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের অভাবে আজো বিধিমালাটি বাস্তব রূপ পায়নি। ফলে নারায়ণগঞ্জে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো যত্রতত্র ফেলছে জনস্বাস্থ্যের জন্য অতীব ঝুঁকিপূর্ণ মেডিক্যাল বর্জ্য। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতাল দুটি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দেওয়া তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায় সিদ্ধিরগঞ্জে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মোট ৪০টি, সদরের বন্দরে ৬টি এবং সদরে ৫৫টি নিবন্ধিত আছে। আরো কয়েকটি নিবন্ধন করার জন্য আবেদন জমা পড়েছে। সব মিলিয়ে শতাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে শুধু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায়। শুরুতে এসব মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব গৃহস্থালির বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিত দুটি এনজিওকে দেওয়া হয়। তাদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল, বর্জ্যগুলো যাতে যথাযথ ও সুরক্ষিতভাবে অপসারণ করা হয় এবং এগুলো ধ্বংস করার জন্য আলাদাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তারা এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সিটি করপোরেশন মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের সঙ্গে যুক্ত প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি করে। তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ করে। একই সঙ্গে ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে প্রিজমের চুক্তি বাধ্যতামূলক করে নাসিক। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত ১০১টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ৮৬টি চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠান প্রিজমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আছে এবং বাকিগুলো এখনো নিজেদের মতো করে বর্জ্য অপসারণ করছে। আর এগুলোর মধ্যেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সরকারি ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট খানপুর হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল। এ দুটি হাসপাতালেই সবচেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনা লক্ষ করা গেছে।
সরেজমিন সরকারি হাসপাতাল দুটি (৩০০ ও ১০০ শয্যা) ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে মেডিক্যাল বর্জ্যসহ গৃহস্থালি বর্জ্য হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে ইটের দেওয়ালঘেরা ফাঁকা উন্মুক্ত জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের ভেতরে রয়েছে সিরিঞ্জ, সুচ, রক্ত, পুঁজযুক্ত তুলা, টিউমার, ব্যান্ডেজ-গজ, হ্যান্ডগ্লাভস, ওষুধের বোতল-শিশি, ব্লাডব্যাগ, স্যালাইনব্যাগ ছাড়াও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য। এভাবে খোলা জায়গায় এসব বর্জ্য ফেলায় যক্ষ্মা, চর্মরোগসহ নানা সংক্রামক রোগে ভুগছে মানুষ। পাশাপাশি ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং এইডসের ঝুঁকিতেও পড়ছে। ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু জাহের বলেন, ‘যে কোনো ময়লা-আবর্জনাই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। আর সেটা মেডিক্যাল বর্জ্য হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো অনেক বেশি। জায়গা না থাকায় আমাদের এভাবে বর্জ্য ফেলতে হয়। তবে সিটি করপোরেশনকে আমরা জানিয়েছি, যাতে এখান থেকে যথাযথভাবে তারা ময়লা-আবর্জনা নেয়। কিন্তু তারা সেভাবে নেয় না। এ কারণে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। তবে আমাদের নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে এ ব্যাপারে আলাদাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এদিকে আরো ভয়াবহ অবস্থা ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায়। সেখানে ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হাসপাতালের সামনের সড়কের ওপরে। সড়ক দিয়ে মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। যদিও হাসপাতাল বর্জ্য বিধিমালায় উল্লেখ আছে যে গৃহস্থালির বর্জ্য ও মেডিক্যাল বর্জ্য আলাদা করে সুরক্ষিত জায়গায় ফেলতে হবে। এবং মেডিক্যাল বর্জ্য ধ্বংস করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মেডিক্যাল বর্জ্য ফেলার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। সব ময়লা হাসপাতালের সামনে রাস্তার ওপর ফেলে আসি। সেখান থেকে সিটি করপোরেশন নিয়ে যায়।’ তবে হাসপাতালের মেডিক্যাল বর্জ্য সিটি করপোরেশন নেয় না জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেডিক্যাল অফিসার শেখ মোস্তফা আলী বলেন, ‘মেডিক্যাল বর্জ্য নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের না। সরকারি হাসপাতাল দুটির অন্যান্য বর্জ্য (খাবারের উচ্ছিষ্টসহ এ ধরনের আবর্জনা) সিটি করপোরেশনের কর্মীরা নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা মেডিক্যাল বর্জ্য আনি না। এই দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রিজমের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য তাদের বলেছি। চুক্তির পর প্রিজম থেকে ময়লা নেওয়া হবে। প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বেশির ভাগ হাসপাতাল, ক্লিনিক আমাদের সঙ্গে চুক্তি করলেও সরকারি দুই হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চুক্তি করেনি। প্রায় এক মাস আগে সরকারি দুই হাসপাতালে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। যদি কেউ আমাদের সঙ্গে চুক্তি করে, তাহলে আমরা অতিদ্রুত সেসব জায়গা থেকে মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ শুরু করব।’
