মোজাহেদুল ইসলাম
বিশ্বজোড়া সিলিকন ভ্যালির খ্যাতির অন্যতম কারণ হলো গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠাগুলো রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে। যদিও বিশ্ব জুড়ে কোম্পানিগুলোর সুনাম বা সিলিকন ভ্যালির সুনাম রয়েছে তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বদৌলতে মধ্যপ্রাচ্যে চলছে রমরমা দাস ব্যবসাও। বিশেষ করে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে নারীর কেনাবেচা চলছে হরহামেশা। যেন মধ্যযুগের বর্বরতা আধুনিক যুগে এসে পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ডিজিটাল যৌবন!
কুয়েতের ১০টি ঘরের মধ্যে নয়টি ঘরেই গৃহকর্মী রয়েছে। তারা সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন গরীব দেশ থেকে আসে। তারা তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগীতার জন্য এ কাজে আসেন। কুয়েতে আসা এমন নারীদের কেনাবেচা হয় অনলাইনের মধ্যমে। বেশিরভাগ ক্রেতা-বিক্রেতারা ফোরসেল ‘4Sale’ নামের অ্যাপটি ব্যবহার করে থাকেন।
সম্প্রতি বিবিসি নিউজ অ্যারাবিক-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাদের হূদয়বিদারক যন্ত্রণার কথা।
বিবিসও ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দাসী হিসেবে এসব নারীদের বিক্রির জন্য দেওয়া হয় চটকদার বিজ্ঞাপন। সর্বোচ্চ দাম হাঁকিয়ে তাদের কিনে নিতেও আছে প্রতিযোগিতা। একবার টাকা খরচ করে কিনলেও ক্ষতি নেই, চাহিদা পূরণের পর আবার বিক্রি করে উঠিয়ে নেওয়া যাবে সেই বিনিয়োগ। ক্রেতা সেজে নারী কেনাবেচার এমনই বাজার প্রত্যক্ষ করেছেন ওয়েন পিনেল ও জেস কেলি। অ্যাপের মাধ্যমে নারীদের বিক্রি করেন এমন ৫৭ জন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। প্রায় এক ডজনেরও বেশি বিক্রেতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাত্ করেছেন বলেও জানান প্রতিবেদকরা।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত ও সৌদি আরব নারী কেনাবেচার নিরাপদ বাজার। ফেসবুকের মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম, অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর ও গুগলের প্লে স্টোরে থাকা অ্যাপ দিয়ে বিকিকিনি চলে দাসীদের। কুয়েতে দাসীদের কেনাবেচার জন্য জনপ্রিয় অ্যাপ হচ্ছে ‘ফর সেল’। সৌদিতে আরবে এমনই একটি অ্যাপের নাম ‘হারাজ’। এছাড়া ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে দাসী বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে যাবতীয় যোগাযোগ ও লেনদেন সারা হয় ব্যক্তিগত মেসেজিংয়ের মাধ্যমে। এসব মাধ্যমে দুই থেকে তিন হাজার মার্কিন ডলারে সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো বেচাকেনা চলে হতভাগ্য নারীদের।
মধ্যপ্রাচ্যের ওই বাজারগুলোতে নারীদের তো বিক্রি করা হয়ই পাশাপাশি তাদের ‘বশে’ রাখার কৌশলও শিখিয়ে দেন বিক্রেতারা। তারা জানান, নারীদের এই নরক থেকে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করে দিতে শুরুতেই কেড়ে নেওয়া হয় তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন। এরপর নিষিদ্ধ করা হয় বাড়ির বাইরে যাওয়া। সামান্য খাবার দিয়ে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখা হয় তাদের। পদবি গৃহকর্মী হলেও মূলত পুরুষদের যৌনদাসী হয়েই থাকতে হয় তাদের।
নারী বা যৌনদাসী ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন বিক্রেতারা। তাদের কৌশল বা অফারগুলোর মধ্যে রয়েছে- এসব নারীদের কে কত দিন না ঘুমিয়ে থাকতে পারে, কে কত কম খাবার খায়, এমনকি কে কোনো প্রতিবাদ করে না, সেসব বিষয় বাড়তি যোগ্যতা আকারে প্রকাশ করা হয়। একদিনও যারা ছুটি চান না বা দিনের ২৪ ঘণ্টাই যাদের দিয়ে কাজ করানো যায়, তাদের দামও বেশ চড়া দরে হাকেন বিক্রেতা। এমন দাস বিক্রিতে কুয়েতের এক পুলিশ কর্মকর্তারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত উর্মিলা ভুলা বিবিসি’কে বলেন, তারা (গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল) মূলত অনলাইন দাসী বাজারকে প্রমোট করছে। এমন অ্যাপ যদি তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকে, তাহলে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এগুলো আধুনিক দাস প্রথার নমুনা।
এদিকে, নিজেদের অ্যালগরিদম থেকে দাসী বা নারী বিক্রির হ্যাশট্যাগ মুছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে ফেসবুক। আর নিজেদের অ্যাপ স্টোরে এসবের সঙ্গে জড়িত অ্যাপস খুঁজে বের করে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছে গুগল ও অ্যাপল। কুয়েত সরকার এর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে বিবিসির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতি বছর গৃহকর্মী হিসেবে অসংখ্য নারী পাচার করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বিশ্বের বিভিন্ন অনুন্নত দেশ অথবা স্বল্পোন্নত দেশের আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবার থেকে মেয়েদের গৃহকর্মীর কাজের কথা বলে নিয়ে আসা হয়। একবার মধ্যপ্রাচ্যে এসে কারও কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া মাত্রই হতভাগা সেসব নারীদের সামনে ফুটে ওঠে দুর্বিসহ জীবনের চিত্র। সূত্র : বিবিসি
