অণুগল্প

ঋণ জাল

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০৬

 

ঋণ করে একটা অটোরিকশা কিনেছে বক্কর। ঋণ দিয়েছে ক্ষুদ্রঋণদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে সবাই ঋণ নেয়। সর্বনিম্ন একলক্ষ টাকা করে সবাই পায়। কেউ বেশি নিতে চাইলে তাও সম্ভব। এই টাকা দিয়ে সে আরো কিছু কিনেছে। এর মধ্যে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসও আছে। ফাতিমাকে বিয়ে করার পর বক্করের সংসার বড়ো হয়েছে। এতিম বক্করের পেট একটা থেকে দুটো হয়েছে। বউ হিসেবে ফাতিমার কিছু চাওয়াপাওয়াও আছে। সব যে বক্কর পূরণ করতে পেরেছে, তা নয়। কিছুটা পূরণ করতে হলেও যা প্রয়োজন তাও বক্করের নেই। তাই সবকিছু মিলিয়ে ঋণ করেছে।

নতুন অটোরিকশা দেখে বাজারের যাত্রীরা বক্করের রিকশায় উঠছে। যাত্রীদের ফাঁকে ফাঁকে বক্কর ফাতিমাকে নিয়েও ঘুরতে যায়। ফাতিমাকে নিয়ে ঘুরতে তার ভালোই লাগে। প্রথম প্রথম লজ্জা পেত, এখন আর পায় না। বক্কর পরিশ্রমী। দিনরাত পরিশ্রম করে উপার্জন করে। অটোরিকশা থেকে যা আয় হয় তার অর্ধেক দিয়ে সংসার, বাকি অর্ধেক দিয়ে ঋণের সুদ দেয়। এভাবে বছর পার হলো। একদিন বক্কর দুপুরে বাড়ি ফিরছিল। রিকশায় কোনো যাত্রী ছিল না। তীব্র বেগে একটি দূরপাল্লার বাস ছুটে আসছিল। বাসটি বক্করের রিকশাকে এমনভাবে ধাক্কা দেয় যে বক্কর ভয়ে রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ে। রিকশাটি বাসের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায়। লাফ দেওয়ার কারণে প্রাণে বাঁচতে পেরেছে। হাতে, পায়ে বেশ আঘাত পেয়েছে। বক্করের রিকশাও প্রচণ্ড ব্যথা পায়, কিন্তু বধির রিকশা কাউকে কিছু বলতে পারে না। বাসের আঘাতে তার অনুভূতি প্রকাশের শক্তিসহ সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। বক্কর কোনোভাবে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটা গাছের নিচে এসে হেলান দিয়ে বসে। কিছুক্ষণ পর আশেপাশের লোকজন এসে বক্করকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। রিকশার জায়গা হয় গ্যারেজে। সপ্তাহখানেক পর বক্কর আবার হাঁটাচলা শুরু করে। কিন্তু বক্করের সঙ্গে তার রিকশা আর হাঁটার সুযোগ পায় না। রিকশাটি যেভাবে ভেঙেছে তাতে করে যা খরচ পড়বে তা দিয়ে একটা নতুন রিকশা কেনা যাবে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। মাস ঘুরলেই সুদের টাকা দিতে হবে, সংসারের খরচ আছে এসব ভেবেই তার অস্বস্তি লাগছে।

সুদের টাকা না দিতে দিতে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিবারই বক্করকে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে আর বক্কর প্রতিবার মৌখিক আশ্বাস দেয়। সুদের টাকা দেওয়া নিয়ে তাদের সংসারে শুরু হয় নতুন অশান্তি। অশান্তি ক্রমেই বাড়তে থাকে। একদিন প্রচণ্ড ঝগড়ার জেরে বক্কর আর ফাতিমা বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে ফেলে। ট্যাবলেটের বিষাক্ততায় দুজনই অসুস্থ হয়ে যায়। পরে আশেপাশের লোকজন জানার পর ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে নিতেই তারা মারা যায়।

এর কিছুদিন পরে পত্রিকায় ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ হয়। সেই তালিকার প্রথম সারিতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হলো ক্ষুদ্রঋণদানকারী সেই প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে ঋণ নিয়েছিল বক্কর।

অলংকরণ : অভিজিত্ চৌধুরী