মহান গান্ধীর নেতৃত্বে জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, মতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাস, চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলসহ আরো অনেকে শামিল হয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের হাত থেকে স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে চৌ এন লাই, লি দাজাও, চেন দুজিউ, চেন গংবো, তাং পিংশানসহ সহযোগীরা বিপ্লবের মাধ্যমে চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইন্দোনেশিয়া দেশটির জাতির জনক সুকর্নের নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছিল। একইভাবে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে একাত্তরে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মলাভ করে। এই স্বাধীনতার সংগ্রামে জাতির পিতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে সেখানকার কারাগারে বন্দি করে রাখে। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সমস্ত দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গিয়েছিলেন। তার নির্দেশনা মেনেই মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন জাতীয় চার নেতা। দুঃসাহসিক ও গৌরবময় সেই মুহূর্তগুলো প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ সেই দিনগুলোতে আমার পিতা এম মনসুর আলী কী দৃঢ় সংকল্প নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে এবং জীবিত বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং কাজ করে গেছেন, তা আমি দেখেছি। খন্দকার মোশতাকের মতো কয়েকজন সুযোগসন্ধানী মুজিবনগর সরকারের এই চার নেতার মধ্যে ফাটল ধরানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন। বেইমান মোশতাক স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করার নানা প্রলোভনের জাল বিস্তার করে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বকে বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু একটি বিপদগ্রস্ত এবং জাতির যুগসন্ধিক্ষণে এম মনসুর আলী অন্য তিন নেতার সঙ্গে থেকে সব ভয়ভীতি, অনিশ্চয়তা ও প্রলোভন উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধকে সফল করেছেন। প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে হাজার হাজার দলীয় সহকর্মী এবং দেশ থেকে পালিয়ে আসা মানুষকে আর্থিক সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। আমি প্রত্যক্ষ করেছি, হাজারো অমানিশার মধ্যেও সাধারণ বাঙালির চেয়ে দীর্ঘদেহী আমার পিতার উজ্জ্বল প্রত্যয়দীপ্ত মুখচ্ছবি। সহকর্মীদের উদ্দেশে তিনি সর্বদা বলতেন, ‘বাঙালির বিজয় অবশ্যম্ভাবী এবং জীবিত বঙ্গবন্ধুকে আমরা ইনশাল্লাহ মুক্ত করব।’ জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে মুজিবনগরে যে মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব সংগঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে একটি মহাকাব্য রচনা করা যেতে পারে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি। আর আমার বাবা এম মনসুর আলী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি বাসভবনে আমরা সপরিবারে বসবাস করতাম। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার দুঃসংবাদটি যখন আমার বাবা পেয়েছিলেন, তখন তিনি কিছু সময়ের জন্য বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। আমার মা, ভাই-বোন সবাই ভেঙে পড়েছিলাম। বাক্রুদ্ধ অবস্থা থেকে স্বাভাবিক হতেই দেখলাম, তিনি শিশুর মতো অঝোরে কাঁদছেন। অসহায় মনসুর আলী সহকর্মীদের পরামর্শে আত্মগোপনে চলে গেলেন। কিন্তু আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ও দেখেছি কী উদ্বেগ, প্রচণ্ড বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর কথা মনে করছেন, অন্যদিকে প্রতিশোধ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছে নিয়ে দলীয় সহকর্মী, তদানীন্তন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নেওয়া নির্দেশ দিচ্ছেন। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমার বাবা মনসুর আলীকে খন্দকার মোশতাক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এম মনসুর আলী বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না। জীবন দেব, তবু তোমার মতো বেইমানের সঙ্গে হাত মেলাব না।’ ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে জীবন দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তার কথা রেখেছেন। নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানী করেননি। সেদিন কারা অভ্যন্তরে যেভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে, এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ সেই পৈশাচিক ঘটনা সম্পর্কে অবগত রয়েছে। বিশ্বাসঘাতক জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। তাদের মন্ত্রী বানিয়ে গাড়িতে লাল-সবুজের পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। এমনকি জাতির পিতা ও তার সহযোগী চার জাতীয় নেতার নামও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টাও করেছিলেন। পরবর্তী সামরিক শাসক এরশাদও জিয়ার পথে হেঁটেছেন। খালেদা জিয়াও তাদের ধারাবাহিকতা অব্যাহতা রাখেন।
তবে একটি কথা না বললেই নয়। জাতীয় চার নেতার নামে শুধু রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। গত মেয়াদে আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিন জাতীয় নেতার নামে তিনটি মেডিক্যাল কলেজের নামকরণ করেছি। এর বাইরে আর কিছুই হয়নি। দলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমার শহিদ পিতা এম মনসুর আলীর আদর্শ বুকে ধারণ করেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আমার বোন, আমার নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমৃত্যু কাজ করে যাব। ৩ নভেম্বর মৃত্যুঞ্জয়ী শহিদ পিতার প্রতি এটাই আমার প্রত্যয়দীপ্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
n লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
