গত পহেলা নভেম্বর হইতে সারাদেশে নূতন সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কার্যকর হইয়াছে। যদিও ইহার বিধিমালা এখনো তৈরি হয় নাই, তবে খসড়া বিধিমালায় চলিতেছে ঘষামাজার কাজ। নূতন আইনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইতে বেশির ভাগ ধারার জরিমানা ১০ হইতে ৫০ গুণ বাড়ানো হইয়াছে। ইহার আগে মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এবং মোটরযান বিধিমালা, ১৯৮৪-এর আওতায় আমাদের সড়ক পরিবহন খাত পরিচালিত হইয়া আসিতেছিল। পুরাতন আইনে লঘু শাস্তির ব্যবস্থা থাকায় তাহা নিয়া সমালোচনা দেখা দেয়। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে এই আইন ও বিধি ছিল অনেকটাই অকার্যকর। তবে নূতন আইন নিয়া অনেকেই আশাবাদী। আগে যেসব ধারায় তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান ছিল, এখন তাহা তিন বত্সর পর্যন্ত হইয়াছে। মূলত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে গত বত্সরের ১৯ সেপ্টেম্বর নূতন সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এই আইনের সবচাইতে আলোচিত বিষয় হইতেছে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান। এই অপরাধে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বত্সরের সাজা বা সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হইয়াছে। ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটাইয়া মানুষের মৃত্যু হইয়াছে প্রমাণিত হইলে ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর হইবে। অর্থাত্, এই আইনে মৃত্যুদণ্ডের সুযোগ থাকিতেছে এবং এই ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য।
আশার কথা হইল, ইতোমধ্যে নূতন আইনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করিয়াছেন পরিবহন মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির নেতৃবৃন্দ। তাহারা অবশ্য জামিন অযোগ্য তিনটি ধারাসহ কিছু ধারা সংশোধনের দাবি জানাইয়াছেন। মালিক-শ্রমিকরা যাহাতে অকারণে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখিবার আহ্বান জানাইয়াছেন। বিশেষ করিয়া শ্রমিক নেতা ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী বলিয়াছেন, শুধু শাস্তির ভয় দেখাইয়া সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনা যাইবে না। তিনি বিধি প্রণয়ন ও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সাজার ধারা জামিনযোগ্য করা এবং ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর না করিবার কথা বলিয়াছেন। তাহার পরও আমরা বলিতে পারি, এই আইন ভারসাম্যমূলক। এইখানে আইন অমান্যের কারণে পথচারীদের জন্যও কঠোর শাস্তির বিধান করা হইয়াছে। যেমন—সড়ক-মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, পদচারীসেতু, পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়া পার না হইলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হইয়াছে। এখন ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে পরিবহন মালিক, চালক ও পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এই আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের নবম অধ্যায় অনুযায়ী দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ, চিকিত্সা ও বিমার ব্যবস্থা করা। বিশেষত, আর্থিক সহায়তা তহবিল পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের কাজ এখনই শুরু করা দরকার।
এতত্সত্ত্বেও আমরা মনে করি, আইন যতই করা হউক না কেন, তাহাতে লাভ হইবে না যদি প্রথমে রাস্তাঘাট ঠিক না থাকে। রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিয়মনীতি না মানা হয়, সড়ক-মহাসড়কে যথারীতি সাইন-সিম্বল না দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, রাজধানীসহ সর্বত্র লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি চলিতে দেওয়া যাইবে না। তৃতীয়ত, আমাদের দেশে সড়ক-মহাসড়ক তৈরির এক শত বা দুই শত বত্সরব্যাপী মহাপরিকল্পনা থাকা দরকার। যাহাতে কেহ সেইসব স্থানে আগে হইতে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করিতে না পারে। আবার মাটির রাস্তা হইলেও যেন থাকে প্রশস্ত ফুটপাত। সড়ক পরিবহন আইন মান্যের পাশাপাশি এইসব নিয়মনীতিও মানিয়া চলা অত্যাবশ্যক।
