ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে। যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এরই মধ্যে আট বছর গত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে বা সমস্যা সমাধানে বিন্দুমাত্র কোনো ইঙ্গিত নেই। অথচ দিন দিন যুদ্ধের আকার ও গোলা-বারুদের গন্ধ বেড়েই চলছে। যা নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই বিশ্বের পরাক্রম দেশগুলোর। বরং যুদ্ধকে উসকে দিয়ে অস্ত্রের ব্যবসা ভালোই জমিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। জাতিসংঘের হিসেব মতে ইয়েমেন যুদ্ধে ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ হাজার ৮০০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। যার দুই-তৃতীয়াংশ বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছেন ১৫ হাজারের অধিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসেব মতে প্রায় ১০ হাজার লোক নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি লোক আহত হয়েছে। আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ। যা মানবিকতার চরম বিপর্যয়। তবে বেসরকারি হিসেব মতে হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে বর্তমান ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অনাহারের শিকার। তারা এখন একবেলা খাবার জোগাড় করতে ব্যর্থ এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে। গত কয়েক মাস আগে আমাল হোসেন নামে এক শিশু ক্ষুধায় কাতর হয়ে মারা যাওয়ার ছবি বিশ্ব দেখেছে। বহু মানুষের চোখে জল এসেছিল এবং বিশ্বের বিবেক স্পন্দন করেছিল। আমালের মতো হাজার শিশু আজ দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছে। World Health Organization (WHO)-এর মতে, ইয়েমেনে যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। যার মধ্যে কলেরার প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে এই রোগের মহামারিতে ২ হাজারের অধিক লোক প্রাণ হারায়। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ লোক এ রোগে আক্রান্ত। যা আগামীতে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
ইয়েমেন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তাদের মানসিক উত্কর্ষ সাধন চরম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আজ তারা বেড়ে উঠছে অনাহার ও পুষ্টিহীনতার মাঝে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, দেশটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১৮ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। যেখানে তারা প্রতিনিয়ত জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করছে। সুতরাং এ যুদ্ধে নতুন এক প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসেব মতে, গত তিন বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ লোক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হওয়ায় দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা যুদ্ধে ২ হাজার ৫০০র বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিপণি বিতান, হাসপাতাল ও পবিত্র জায়গাগুলো। ইয়েমেনে অর্থনৈতিক অবস্থা পঙ্গু। হাজার হাজার যুবক আজ বেকার, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বগামী। সাধারণ জিনিসের মূল্য নাগালের বাইরে। এমন কি দুর্যোগপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় কয়েক বছর ধরে শীর্ষে আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন।
মানব সভ্যতার পুরোনো ইতিহাস, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশটি আজ গোলা-বারুদের ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার চিত্কার আধুনিক অস্ত্রের কাছে বড়ো ম্লান। এটাই ইয়েমেনবাসীর জন্য চরম বাস্তবতা। আজ তারা মৃত্যুর কাছাকাছি বাস করছে, অবস্থাদৃষ্টে অনেকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিয়র্ট কাপপেলারকি এই অবস্থাকে জীবন্ত নরক বলে অভিহিত করেছেন। হাজারও শিশুর ক্ষুধার কান্না দেখেও বিশ্ববাসী আজ নীরব দর্শকের ভূমিকায়। এখন প্রশ্ন জাগে বিশ্বের বিবেক জাগবে কবে? ইয়েমেনবাসী প্রতিদিন গোলা-বারুদের গন্ধ ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ঘুমাতে যাচ্ছে। তারা এটাও জানে না যে, ভোরবেলা নতুন সূর্য দেখতে পারবে কি না?
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
