প্রশ্ন : নারীত্ব বা স্ত্রীপ্রকৃতি অত্যন্ত অপূর্ব একটি গুণ হওয়া সত্ত্বেও সারা বিশ্বে নারীজাতি শোষিত হয়। এই বিষয়টা আমাদের মর্মাহত করে। এরকম কেন?
উত্তর :বাস্তবে যে কোনো বস্তুই শোষিত হতে পারে, কেবল নারীত্ব নয়। এটা ভাববেন না যে পুরুষরা শোষিত হয় না। শোষণ সব স্তরে ঘটে—মানুষ, জন্তু-জানোয়ার, গাছপালা, সবকিছুই শোষিত হয়, তাই না? মানুষ সবকিছুকেই শোষণ করে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে শোষণ ঘটছে বলে আমরাও সবকিছু যা সুন্দর তা ধ্বংস করে দেব। মালা তৈরি করতে গেলে ফুলকে ছিন্ন করতে হয়। এটাও শোষণ। তার মানে কি আমরা ফুল ফোটানো বন্ধ করে দেব? না। বরং যদি প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটানো হয়, তাহলে কোনো দিন মালা বানানো বন্ধ হলে, অন্তত সব জায়গায় ফুলগুলো থেকেই যাবে।
এক ধরনের জঘন্যতাকে আটকাতে অন্য ধরনের জঘন্যতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, পৃথিবীতে এরকমই হয়ে এসেছে। একজন কুিসত কিছু একটা করল, তার জবাবে আপনি তার থেকেও জঘন্য কিছু একটা করে বসলেন। আপনাকে হয়তো কেউ কোনোভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, তাতে আপনি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন বা হতাশ ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। এতে কিন্তু আপনারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো। আপনি যদি নিজের সঙ্গে এরকম করতে শুরু করেন, তাহলে অন্য কারোর প্রয়োজন হবে না আপনাকে শোষণ করার; আপনি নিজেই নিজের শত্রু হয়ে উঠবেন। যখন আপনি নিজের সঙ্গে এই রকম ভয়াবহ আচরণ করবেন, তখন অন্যরাও তাতে সানন্দে যোগদান করবে। কারণ, তারা তো এই সুযোগই খুঁজছে! তারা আপনাকে কেবল একটু ধাক্কা দেবে, আর ব্যস, বাকিটা আপনি নিজেই করে নেবেন!
অন্যরা কী করছে বা পৃথিবীতে কী হচ্ছে, সেটা রাতারাতি বদলানো যায় না। কিন্তু আপনি যদি ইচ্ছুক হন, তাহলে এক মুহূর্তে নিজেকে পরিবর্তন করা সম্ভব। আর এই রূপান্তরটা যদি আপনি নিজের মধ্যে না ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে যে মানুষটি আপনাকে শোষণ করছে সেই মানুষটির থেকে আপনার তফাত কী? আপনার অভিযোগ করার অধিকার নেই, কারণ আপনি তো নিজেই নিজেকে শোষণ করছেন।
অন্য কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ কিছু করছে, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি খারাপ তো আপনি নিজেই নিজের সঙ্গে করছেন। যদি তারা দেখে যে আপনি এরকম নন, আপনি বিষাদগ্রস্ত হয়ে বা ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের ক্ষতি করেন না, তখন তারা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে। এই ধরনের নারীরা গোটা বিশ্বে রূপান্তর আনতে সক্ষম।
তাহলে আসুন, প্রথম পদক্ষেপটা নেওয়া যাক। নিজের সঙ্গে এরকম জঘন্য ব্যাপার করা বন্ধ করুন। তারপর দেখা যাক, অন্যরা আপনাকে কিছু করতে পারে কি না। তখন বাহ্যিক সমস্যাটা খুবই সামান্য হয়ে যাবে এবং অনায়াসেই আপনি সেটাকে সামলাতে পারবেন। এটা সকলের জন্যই সত্য—পুরুষ বা নারী। কেউ-না-কেউ সব সময়ই আপনাকে আঘাত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু যখন তারা দেখবে যে তাদের এ কাজের কোনো প্রভাব পড়ছে না আপনার ওপর, আপনার যা করার আপনি সাবলীলভাবে করেই চলেছেন—তখন তারাও আপনার সঙ্গে যোগ দিতে চাইবে।
এই মুহূর্তে যে-কেউ আপনার জীবনের ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে। আপনাকে কেবল একটা-দুটো কথা বলেই আপনার সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে। অর্থাত্, আপনি কেমন থাকবেন সেটা অন্য কারোর হাতে—এটা মর্যাদাসম্পন্ন নয়। আপনি নিজে নির্ণয় করবেন আপনি কেমন থাকবেন—এটাই মর্যাদাসম্পন্ন। আপনি যদি সব সময় প্রতিক্রিয়াশীল হন, তখন অন্যরা আপনার ভালো থাকাটা নিয়ন্ত্রণ করবে। শোষণের মুখেও আপনি প্রভাবিত হবেন না, এটা নিশ্চিত করা আপনারই দায়িত্ব। এই দায়িত্ব যদি আপনি নিজের হাতে তুলে না নেন আর আপনি যদি প্রতিক্রিয়াশীল হতেই থাকেন, তাহলে অবিরত এটা চলতে থাকবে। কিছু সময়ের মধ্যেই আপনি মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবেন।
মানবমর্যাদা আপনার সংগ্রাম থেকে আসে না। প্রকৃত মর্যাদাসম্পন্ন হলেন তিনি, যিনি পাপ আর পুণ্যের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের মধ্যে এক সাম্যের মাত্রা আনতে পেরেছেন। যার ফলে তিনি সাফল্য ও ব্যর্থতার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে কর্মরত থাকতে পারেন, গ্রহণযোগ্যতা ও বর্জনীয়তার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারেন, স্বীকৃতি এবং শাস্তির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারেন, জীবন ও মৃত্যুর দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারেন। যিনি জীবনের যে কোনো পরিস্থিতির মধ্যে নিজের অন্তর-প্রকৃতিকে সাম্যময় রাখতে পারেন, তিনিই প্রকৃত মর্যাদাপূর্ণ।
n সৌজন্যে :ঈশা ফাউন্ডেশন
