দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিতে বর্তমানে অস্থিরতা বিদ্যমান। কোনো কোনোটিতে চলিতেছে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। কতিপয় উপাচার্য এবং উপ-উপচার্যের নানা অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির খবরও প্রকাশিত হইতেছে সংবাদমাধ্যমে। শিক্ষার মান নিয়াও উঠিতেছে প্রশ্ন। তবে বড়ো সমস্যা হইল, অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পদগুলি শূন্য। ইহাতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা ইতিপূর্বে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারারের বিভিন্ন পদ শূন্যের কথা লিখিয়াছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকগণ অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে এবং শিক্ষাবাণিজ্যের পথ অবারিত রাখিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি শূন্য রাখিতে কিংবা ভারপ্রাপ্তদের দ্বারা জোড়াতালি দিয়া চালাইতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও যখন একই দশা বিরাজ করে, তখন তাহাতে আমরা বিস্মিত না হইয়া পারি না। ইহাতে শিক্ষার্থী ও দেশের যে কত বড়ো ক্ষতি সাধিত হইতেছে, তাহা দেশপ্রেমিক ও বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ মাত্রই সঠিকভাবে উপলদ্ধি করিতে সক্ষম। একটি প্রজন্ম এইভাবে এমন অদক্ষ হইয়া বাহির হইতেছে যাহাদের হস্তে একদিন দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নতি বিঘ্নিত না হইয়া পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বর্তমানে একটিতে ভিসি বা উপাচার্য নাই। ছয় মাস শূণ্য থাকিবার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চার মাস শূন্য থাকিবার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত রবিবার উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। তবে বর্তমানে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদটি শূন্য। ইহা ছাড়া প্রো-ভিসি নাই ২৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তন্মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ট্রেজারার নাই ২৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকও নাই। এই যদি হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বর্তমান অবস্থা, তাহা হইলে সেইখানে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা দূরের কথা, স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হইবে কীভাবে?
পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষস্থানীয় এইসব পদে নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভিসি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেট তিনটি নামের প্রস্তাব করে থাকে। তাহাদের মধ্যে একজন সেই পদে নিয়োগ পান। তবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগে মূল ভূমিকা পালন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাহারা এইসব পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করিয়া সরকারের নিকট প্রস্তাব দেন। দীর্ঘদিন ধরিয়া যদি এইসব পদ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্য থাকে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে এইখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েয় গড়িমসি, অবহেলা বা উদাসীনতা রহিয়াছে। দায়িত্বহীনতাও যে নাই তাহা আমরা অস্বীকার করি কী করিয়া! অনেকে মনে করেন, ভিসির দায়িত্ব সুচারুরূপে করিতে পারেন আমাদের এমন দক্ষ অধ্যাপকেরও অভাব বিদ্যমান। বর্তমানে পাবলিক-প্রাইভেট মিলাইয়া দেশে প্রায় দেড় শত বিশ্ববিদ্যালয় রহিয়াছে। প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে আরো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রহিয়াছে। কিন্তু দেশে দেড় শত জন ভালো মানের অধ্যাপকও খুঁজিয়া পাওয়া মুশকিল। ফলে শূন্য পদে শুধু নিয়োগ দিলেই চলিবে না, প্রার্থীর একাডেমিক এক্সিলেন্স, লিডারশিপ কোয়ালিটি ও ইন্টিগ্রিটি অব ক্যারেক্টর বৃদ্ধিতে প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের কথাও ভাবা যাইতে পারে।
