একুশ শতকে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের হালচাল

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০১

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের হাওয়া চাঙা হয়েছিল। বার্লিন দেওয়াল ভাঙার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের পতন গণতন্ত্রের জন্য একটি উন্মুক্ত প্লেস তৈরি করে দেয়। আর তখনই পৃথিবীর দিকে দিকে পুঁজিবাদের সঙ্গে গণতন্ত্রেরও ব্যাপক প্রসার ঘটে। নতুন নতুন গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয় নিত্য-নতুন উপাদান, যা গণতন্ত্রকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। তাই এই শতাব্দীতে এসে গণতন্ত্রের সঙ্গে জন-আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো পরখ করলে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবস্থা জানা যাবে।

এখনকার প্রভাবশালী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করেন, গণতন্ত্র এই শতাব্দীতে এসে চরম হোঁচট খেয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আকাঙ্ক্ষার তফাত বেড়ে যাওয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। গণতন্ত্রের অধঃপতনের চিত্র উঠে এসেছে Freedom House,  Polity এবং  Economists Intelligence-এর রিপোর্টে। আন্তর্জাতিক এসব সংস্থার রিপোর্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের অধঃপতন হচ্ছে। খোদ আমেরিকা ২০১৮ সালে Freedom House-এর রিপোর্টে ৩ পয়েন্ট হারিয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদের মতো প্রলুব্ধকর চাল চালছেন নেতৃবৃন্দ। গণতান্ত্রিক দেশে অগণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একুশ শতকের বিশ্বরাজনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে। তাছাড়া সারা বিশ্বে ডানপন্থিরা শক্ত অবস্থান তৈরি করছে, যার ফলে মধ্যপন্থিদের রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ডানপন্থিদের অভিবাসনবিরোধী নীতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মবিদ্বেষ তাদের ভোটের রাজনীতিতে সফল করলেও বিশ্বরাজনীতির জন্য  হুমকি তৈরি করছে।  রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের সূচক নিম্নমুখী হওয়ার কারণ হিসেবে মনে করেন, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাও অত্যধিক হওয়া। গণতন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কতগুলো শাসনব্যবস্থা পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকলেও তা নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে এখনো বৈশ্বিক হওয়ার জন্য লড়াই করছে। যেমন চীনা মডেল, রাশিয়ার নব্য জারতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও ইসলামি খেলাফত। হেগেলের ভাষ্যমতে, দুটি ধারণার মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এ দুটির মধ্যে একটি টিকে যাবে, অন্যটির পতন হবে। এই সূত্রে একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রকে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।

এদিকে Freedom House-এর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গণতন্ত্রের পশ্চাত্পসরণ হচ্ছে। রিপোর্টে পশ্চাত্পদের কারণসমূহের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতাকে বড়ো করে দেখা হয়েছে। সব ধরনের গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্য ট্রাস্ট ডিফেসিট একুশ শতকের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল-জোটের প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। এর ফলে একটি এ-পলিটিক্যাল সোসাইটির (অরাজনৈতিক সমাজ) উদ্ভব ঘটছে। এসব বৈশিষ্ট্য গণতন্ত্রের অধঃপতনের পরিচায়ক।

গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যে নতুন নতুন উপাদান সংযুক্ত হয়েছে, যার ফলে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র আরো বেশি গ্রহণযোগ্য ও আস্থাশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন এই প্রবণতাগুলোর মধ্যে রেফারেন্ডাম বা গণভোট অন্যতম। গণভোটের ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণকে আগের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত করা যায়। অংশগ্রহণমূলক বাজেট ও ভবিষ্যত্ কর্মপরিকল্পনা নাগরিকদের গণতন্ত্রের দৃষ্টি নিবন্ধিত রাখতে কাজ করছে। গার্ডিয়ান ইনস্টিটিউশন তৈরি করা হচ্ছে, ফলে সরকারের কর্মকাণ্ডে আরো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আভাস দিচ্ছে। তাছাড়া রাজনীতির ওপর বুদ্ধিজীবীদের নজরদারি রাখতে কিছু দেশে রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের অনুদান দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ  সিমিটার মনে করেন, এসব উপাদান গণতন্ত্রকে একুশ শতকে আরো বেশি প্রভাবশালী করবে।

মোটকথা, একুশ শতকের গণতন্ত্রের আলোচনা যেমন জটিল হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন গৌণ উপাদানের সংযুক্তির ফলে এই শতাব্দীতে গণতন্ত্রের চর্চা আরো বেশ জটিল হবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে সারা বিশ্বের গণতন্ত্র একই রকম হবে না। কোথাও উদারনৈতিক গণতন্ত্র, আবার কোথাও রক্ষণশীল গণতন্ত্র দেখা যেতে পারে। বিশ্বে শান্তি বজায় রাখার জন্য গণতান্ত্রিক পিস তত্ত্ব কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া Identity Politics-এর এই যুগে একক পরিচয়ের বদলে বহু পরিচয় রাজনৈতিক বিভাজন থেকে রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে পারে। সর্বোপরি বলা যায়, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণতন্ত্রকে এটির প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতো অনেক চড়াই-উত্রাই পারি দিতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়